আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার:
হর্সশো ক্র্যাব বা রাজকাঁকড়ার মতো বঙ্গোপসাগরের মাত্র একটি মূল্যবান প্রাণীকে কাজে লাগিয়েই দেশে প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের কয়েকগুণ আয় করা সম্ভব। বর্তমানে প্রতিবছর নানাভাবে লক্ষ লক্ষ রাজকাঁকড়া মারা যাচ্ছে। কেবল বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাট থেকে নাজিরারটেক মোহনা ও মহেশখালী চ্যানেলের মাত্র ১০ কিলোমিটার এলাকায় বিহিন্দি জালে মারা পড়ছে প্রতিবছর লক্ষাধিক রাজকাঁকড়া। দেশের অন্যান্য স্থানেও একই পরিণতির শিকার হচ্ছে মূল্যবান এ প্রাণীটি। ‘জীবন্ত জীবাস্ম’ নামে পরিচিত পৃথিবীর এ আদি প্রাণীটিকে প্রকৃতিতে নির্বিঘœভাবে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে যাদুকরী পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।
গতকাল সোমবার ২০ জুন ইন্টারন্যাশনাল হর্সশো ক্র্যাব ডে বা বিশ^ রাজকাঁকড়া দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট আয়োজিত এক সেমিনারে গবেষকরা এমন মন্তব্য করেন। ‘রাজকাঁকড়াকে জানি, রাজকাঁকড়াকে বাঁচাই’ শীর্ষক ওই সেমিনারের দুটি পর্বে ভারত ও বাংলাদেশের বিজ্ঞানী-গবেষকরা ছাড়াও স্থানীয় পরিবেশ স্বেচ্ছাসেবীরা বক্তব্য দেন।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট এর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. সগির আহমদ এবং সেমিনারে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভারতের উড়িষ্যার কেএম কলেজ অব বেসিক সায়েন্সের অধ্যক্ষ ও রাজকাঁকড়া বিশেষজ্ঞ ড. গোবিন্দ চন্দ্র বিসওয়াল। সেমিনারে ‘রাজকাঁকড়া সংরক্ষণ, সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা’ সম্পর্কে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কক্সবাজারস্থ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিএফআরআই) এর সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কেন্দ্র প্রধান ড. শফিকুর রহমান। রাজকাঁকড়ার জৈব রাসায়নিক গুণাগুণ সম্পর্কে ভার্চুয়ালি প্রবন্ধ উপস্থাপন ভারতের বালাসুর কুন্তলা কুমারী সবাত মহিলা কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. জ্যোতির্ময়ী প্রধান। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট এর বায়োলোজিক্যাল ওশ্যানোগ্রাফিক বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সায়ীদ মোহাম্মদ শরীফের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া উক্ত সেমিনারে রাজকাঁকড়ার বায়োমেডিক্যাল বা জৈব ওষুধী ব্যবহার ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেন ইন্সটিটিউটটির মহাপরিচালক সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর।
সেমিনারে উড়িষ্যার কেএম কলেজ অব বেসিক সায়েন্সের অধ্যক্ষ ও রাজকাঁকড়া বিশেষজ্ঞ ড. গোবিন্দ চন্দ্র বিসওয়াল বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেখানো পথে রাজকাঁকড়ার মূল্যবান ওষুধী গুণকে কাজে লাগিয়ে ভারত-চীনসহ বিভিন্ন দেশে বায়োমেডিক্যাল প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক খাতে সমৃদ্ধি বয়ে আনছে।
তিনি বলেন, ভারত, চীন ও আমেরিকায় যদি রাজকাঁকড়ার চাষ হতে পারে, তাহলে কেন বাংলাদেশে হবে না?
রাজকাঁকড়াকে জানলে আমরা তাকে বাঁচাতে পারব বলে মনে করেন তিনি।
সেমিনারে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট এর মহাপরিচালক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর তাদের প্রতিষ্ঠানের গত এক বছরের গবেষণা অগ্রগতি সম্পর্কে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে রাজকাঁকড়ার প্রজনন ও বিচরণস্থল চিহ্নিত করতে পেরেছি। তাদের জন্য একটি অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে পারলে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ রাজকাঁকড়া রক্ষা পাবে। যার অর্থনৈতিক মূল্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকা।
বিএফআরআই এর সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কেন্দ্র প্রধান ড. শফিকুর রহমান গত এক বছরের গবেষণা অগ্রগতি তুলে ধরে বলেন, কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা রাজকাঁকড়ার ঘরোয়া প্রজনন প্রযুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে নিরলসভাবে গবেষণা কাজ করে যাচ্ছেন। এরজন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। কারণ একটি রাজকাঁকড়া ডিম থেকে বাচ্চা হয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হতে ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগে। আর বাঁচে প্রায় ২০ বছর।
সেমিনারে উন্মুক্ত আলোচনায় আরো অংশ নেন পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হর্সশো ক্র্যাব কনজার্ভেশন গ্রæপ, বাংলাদেশ’ এর টিম লিডার আহমদ গিয়াস, আইইউসিএন এর আসমা, ওয়ার্ল্ডফিশের উত্তম, স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশকর্মী মোক্তার মিয়াসহ অন্যান্যরা।
‘হর্সশো ক্র্যাব কনজার্ভেশন গ্রæপ, বাংলাদেশ’ এর টিম লিডার আহমদ গিয়াস বলেন, প্রজননস্থল ও আবাসস্থলকে নির্বিঘœ করেই আমরা প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরে কয়েক কোটি রাজকাঁকড়ার প্রাচ‚র্য গড়ে তুলতে পারি। আর মাত্র এক কোটি রাজকাঁকড়ার অর্থনৈতিক মূল্য জাতীয় বাজেটের অন্তত তিন গুণ।
২০ জুন তৃতীয় ‘আন্তর্জাতিক রাজকাঁকড়া দিবস’ উপলক্ষে প্রথমবারের মতো দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে পালন করা হয় বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে। কর্মসূচির অংশ হিসাবে সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও সেমিনারের পর বিকালে শহরের বাঁকখালী নদী থেকে সোনাদিয়া দ্বীপ পর্যন্ত রাজকাঁকড়ার বিচরণস্থল পরিদর্শন ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়।
সেমিনারে উপস্থিত সকলেই যার যার অবস্থান থেকে রাজকাঁকড়া রক্ষার জন্য এবং জনগণকে উদ্বুদ্ব করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।

 
  
%d bloggers like this: