উত্তরাধিকার

প্রকাশ: এপ্রিল ১৮, ২০২২ ৪:০৩ am

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


-মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম

বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ থেকে শুরু করে, মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা- সবকিছুই ঘটেছে বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আ.লীগের হাত ধরে ।

বঙ্গবন্ধুর আর্দশ, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কাজ করছে উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামি লীগ। ১৯৬৮ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর উপস্থিতিতে কক্সবাজার মহকুমা (সাংগঠনিক জেলা) আ.লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।

কক্সবাজার মহকুমা আ.লীগ প্রতিষ্ঠার পূর্বে জাতির পিতার সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন আমার পিতা মরহুম মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম। তিনি প্রতিষ্ঠাকালিন কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামীলীগের প্রথম সাংগঠনিক সম্পাদক। পরবর্তী তে মহকুমা কৃষক লীগের আহবায়ক। কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সম্পাদক মন্ডলীর দ্বায়িত্ব পালন করেন। সৃজনে, সাহসে, সংকল্পে ও আত্মত্যাগে অতুলন বঙ্গবন্ধুর ২য় বিপ্লব বাকশাল কর্মসূচির কেন্দ্রিক কমিটির পলিটব্যুরো সদস্য মনোনীত হন।

আমার মেঝ আব্বা মরহুম এডভোকেট জহিরুল ইসলাম ৭০’র ঐতিহাসিক নির্বাচনে সংসদ সদস্য, বাকশাল কর্মসূচির জেলা গভর্নর এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত দীর্ঘদিন কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এর গুরুদ্বায়িত্ব পালন করেছেন, ছিলেন কেন্দ্রিয় আওয়ামীলীগের কার্য নির্বাহী সংসদের সদস্য। পারিবারিক ভাবেই রাজনৈতিক পরিমন্ডলে জীবন যাপন শুরু শৈশবে কৈশোরে। কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের জাতীয় দিবসের কর্মসূচী পালনে জড়িয়ে পড়ি ঐকান্তিক ভাবে। একুশের প্রভাত ফেরী, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে সকালে স্টেডিয়ামে কুচকাওয়াজ, সন্ধ্যায় আওয়ামীলীগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও কোরাস গানে অংশগ্রহন করা আমার নিয়মিত কাজ হয়ে উঠে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পক্ষে ১৯৯৩ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার আসেন জনসভায়। সেই সময়েই আপা কে প্রথম দেখার এবং আপার বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য অর্জন করি। বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি যখন ১৫ আগষ্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা বলছিলেন তখন হঠাৎ খেয়াল করি আম্মা, চাচি ও আমার আপাদের চোখ ভিজে আছে জলে। তাঁদের আবেগ অশ্রু সজল চোখের দিকে তাকিয়েই অনুভব করি বঙ্গবন্ধু পরিবারের শহীদের রক্তের উত্তরাধিকার আমরা। কাজেই বঙ্গবন্ধু কন্যা একা নন। এদেশের মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর মাঝে পৌছাতে তিনি এসেছেন আলোকবর্তিকা হয়ে।

সেই থেকে পাড়ার নির্বাচনী মিছিল, প্রচারণার কাজে অংশগ্রহণ করতে ভালো লাগত। আব্বার পত্রিকা অফিস ও মেঝ আব্বার বাসায় রাজনৈতিক আড্ডায় ধীরে ধীরে চিনতে শিখি শ্রদ্ধেয় মরহুম মোজাম্মেল হক চাচা, সাবেক রাষ্ট্রদূত ওসমান সরোয়ার আলম চাচা, নজরুল ইসলাম মামা, আহামেদ হোসেন মামা, রব্বান মামা, এড. আমজাদ হোসেন সহ প্রয়াত নেতৃবৃন্দদের এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় আওয়ামিলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এড. সিরাজুল মোস্তফা মামা, বর্তমান জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এড.ফরিদুল ইসলাম মামাসহ তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ফরিদ ভাই, রেজাউল ভাইদের সাথে গড়ে উঠে সখ্যতা ও নিবিড় বন্ধন।

সেই সময়েই প্রবীণ নেতারা ছোটদের মধ্যে আমাকে একটু বেশী আদর ও স্নেহ করতেন, কারণ আমি আবৃত্তি, গান, নাটক, প্রচারণার মাইকিং করতাম সুযোগ পেলেই।

আম্মা, আপারা আমার লেখাপড়া ফাঁকি দিয়ে এসব কাজে বেশী না জড়াতে চাপ দিলেও আমি সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম। পরিবারে মুরব্বিদের বৈঠকে আমাকে শাসনের দায়িত্ব প্রদান করা হলো মেঝ আব্বাকে। মেঝ আব্বার নির্দেশ লেখাপড়ার জন্য আমাকে যেনো নানার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন তিনি আরো বলেছিলেন আমাদের পরিবারে নজীব একদিন রাজনীতিতে ভালো করবে। পরে মেঝ আম্মা একদিন সকালের নাস্তার টেবিলে কথাগুলো বলেছিলেন সবার সামনে।

সে সময়ের বাহন কোষ্টার যোগে যথারীতি কান্না করতে করতে আব্বা আম্মা সহ নানার বাড়িতে যাত্রা। আব্বা গাড়িতে ভ্রমন করলে ওনার পছন্দের কিছু রবীন্দ্রনাথের ও দেশাত্মবোধক গানের ক্যাসেট ও টেপরেকর্ডার সাথে রাখতেন। তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন গান শুনতে।

প্রফেসর মমতাজ আহমেদ মামা ও মামির তত্বাবধানে নানাবাড়িতে আমার নতুন জীবন শুরু। আমার দাদা ও নানা বাড়ি দীর্ঘ সময় কাল একান্নবর্তী পরিবার ছিল। নানা বাড়িও ছিল রাজনৈতিক চিন্তা ও ভাবধারার পরিবার। নানা ও মামারা অনেকেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। মামা ও মামাত ভাইরা রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় ছিলেন। একবার স্বৈরাচার এরশাদ জনসভায় আসেন চকরিয়াতে। তৎকালীন চকরিয়া কলেজের ছাত্ররা তাঁকে অপমান করে। এই ঘটনায় আমার ৩ মামাত ভাই এর উপর হুলিয়া জারি হয়, আমার প্রফেসর মামা তখন উপাধ্যক্ষ। ওনার নাকানিচুবানি খাওয়া দেখেছি তখন, কারণ ওনার পরিবারের ৩ সদস্য অন্যতম আসামী। তখন সালাউদ্দীন মাহমুদ ভাই জাতীয় পার্টির নেতা, উনি আমার প্রফেসর মামার স্ত্রীর আপন ভাগিনা, যার করণে উনি ঐ যাত্রায় কিছুটা বেঁচে গেলেও তৎকালীন চকরিয়া কলেজ অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন সাহেব অনেকটা চাপ সহ্য করতে না পেরে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সবকিছু দেখে আমি নিজেও ছাত্রলীগের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ি। প্রফেসর মামা আমাকে একদিন চকরিয়া কলেজের একটি মিছিলে দেখে বাসায় এসে আব্বা আম্মা কে ফোন করে আমাকে কক্সবাজার নিয়ে যেতে বলেন। আমি তখন চকরিয়া পাইলট স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। আমাদের স্কুল মাঠেই স্বৈরাচার এরশাদ কে অপমান করা হয়েছিল।

কক্সবাজার এসে প্রথমে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে সাহিত্যকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেনীতে ভর্তি হলেও ক্লাসে ছিলাম অনিয়মিত। স্কুলে থাকাকালীন স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ি। হরতালের দিন ভোর বেলায় মেঝ আব্বা একা বাসা থেকে বের হলে আমরা ভাইরা অনেকে ওনার অজান্তে ওনার পিছু নিতাম, উনি নিজেই পিকেটিং করতেন, দোকান বন্ধ রাখতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করতেন। পিকেটিং এর ব্যাপকতা বাড়লে আমরাও পিকেটিং এ সক্রিয় হতাম।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও স্কুলে অনুপস্থিতির কারণে আমাকে আবার চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দেওয়া হয় খালার বাসায়। ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় চট্রগ্রাম গভ. মুসলিম হাই স্কুলে। মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি হলেও সিটি কলেজ, ওমর গণি কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের কর্মসূচীতে প্রায় যেতাম। কক্সবাজারের মরহুম আসিফ কামাল লাভু ভাই তখন চট্টগ্রামের তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা।

১৯৮৯ সালে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ফেরত চলে আসি, তখন স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিল, মিটিং, হরতাল। রাতে পটকা ফুটিয়ে হরতালে আতংক সৃষ্টির মত এক গেরিলা রাজনৈতিক জীবন আমার শুরু।

তখন আমাদের বাসায় নিয়মিত ১৪ দলের গোপন বৈঠক ও রাতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের আত্নগোপনে থাকা শুরু হয়। আমাদের বাসা এবং পত্রিকা অফিস এক সাথে হওয়ায় পুলিশি তল্লাশি ও অভিযানের ঝুঁকি কম বলে মনে করতেন তৎকালীন নেতৃবৃন্দ।

নব্বইয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতন, ১৯৯১ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পরবর্তীতে মেঝ আব্বার গণফোরাম গঠনের পরে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে পড়ি।

আমি তখন কক্সবাজার সদর উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

প্রথমে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কক্সবাজার জেলা শাখার যুগ্ন সম্পাদক। ১৯৯৬ এ সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক, বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক এর দ্বায়িত্ব পালন করছি। সাংস্কৃতিক আন্দোলন আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রাণ শক্তির নির্মল নিঃশ্বাস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বদেশ বিনির্মাণে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে এই জনপদের পশ্চাৎপদতা, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে নিজেকে সক্রিয় রেখেছি।

২০১২ সালে তৎকালীন পৌর আওয়ামীলীগ সভাপতি জননেতা মুজিবুর রহমানের পরামর্শে পৌর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়। তৎকালীন পৌর আ.লীগর কমিটিতে যুগ্ন সম্পাদক সম্পাদক হিসেবে আমাকে কো-অপ্ট করা হয়। আমার মরহুম পিতা তখন জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি, মুজিব ভাই কে ওনি খুবই স্নেহ করতেন, কারণ মোজাম্মেল হক চাচার মৃত্যুর পর জেলা শহরে মুজিব ভাই আওয়ামীলীগ এর জন্য সার্বক্ষনিক কাজ করেছেন পৌর আওয়ামীলীগের মাধ্যমে। ১/১১ সময় কালে আব্বা জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য গণস্বাক্ষর সংগ্রহ সহ জনমত গঠনে কক্সবাজার পৌর ও সদর উপজেলার সমন্বয়কের দ্বায়িত্ব পালন করেন, এই কর্মসূচী সফল করতে গিয়ে মুজিব ভাই কারাবরণ করেন।

আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে, রাজনীতিতে চলছে মাইনাস টু ফর্মূলা। এক এগারোর কূশীলবেরা দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কঠিন ও দুঃসহ সময় পার করছে রাজনৈতিক দল সমূহ।
সেই বছরে আব্বা নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে নিয়ে ১৫ই আগষ্ট জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচী পালন করেছেন।

আব্বার শারীরিক অবস্থা তখন ভালো যাচ্ছিলো না। জটিল রোগে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে শরীরে। সারাদিন মিটিং মিছিলের পর বাসায় এসে খুব দূর্বল হয়ে পড়তেন তিনি। আম্মা সহ বাসার সকলে দুশ্চিন্তায় থাকতেন সর্বদা।

আব্বা আমাকে পৌর আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে দেখে উৎফুল্ল ও আনন্দিত হতেন। সংগঠন, দেশ, রাজনীতি, সাংগঠনিক তৎপরতা, প্রচারণা সহ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। ডাক্তারের পরামর্শে রাজনৈতিক সভা গুলোতে নির্দিষ্ট কিছু সময় কাটিয়ে পত্রিকা অফিসে অথবা বাসায় চলে আসতেন আব্বা। চলে আসার সময় নিশ্চিত হতেন আমি ঐ সভায় উপস্থিত আছি কিনা। আমাকে না দেখলে ফোন করতেন, সভাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা বলে চলে আসতেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আর্দশের পথচলায় নিজের উত্তরাধিকার কে রেখে যাচ্ছেন। এইটুকু হয়তো আব্বার স্বস্তির কারণ ছিলো।

১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু কে হত্যা করলেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কে হত্যা করা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর পুরা পরিবার কে হত্যা করা হলেও, হাসিনা আপা, রেহেনা আপা আজ একা নন। ১৯৮৩ সালের নির্বাচনী জনসভায় যে অশ্রু সজল নয়ন দেখেছি আমার পরিবারের স্বজনদের চোখে। সেই থেকে অনুভব করি এই বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে অজস্র মুজিববাদী পরিবার, শেখ মুজিবের চিন্তা ও আর্দশকে লালন করবার শত সহস্র পদাতিক।

আগামী প্রজন্মের উত্তরাধিকার বেড়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে। বর্তমানের উত্তরাধিকার কে প্রতিনিয়ত রাজনীতির নীতি ও নৈতিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমাদের অনুভূতি এক, আমাদের রক্ত এক। কক্সবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে অগ্রজদের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের স্নেহ করতে আমরা শিখেছি। বিপদে সংকটে ঐক্যবদ্ধ থাকতে শিখেছি।

“এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;
তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি-
চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি।”

 
  
%d bloggers like this: