ম্যারি ওলিনিক
অনুবাদে এম,ডি, ম্যাক্স

একজন রাশিয়ান হিসেবে কি আমি দুখিত, লজ্জিত? এই প্রশ্নগুলো আমাকে গত এক দশক ধরে পুড়ে খাচ্ছে। কিন্তু কয়েকদিন আগে যখন সত্যিই আমার দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে গেল, আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিনা।
আমি আমার দেশ রাশিয়াকে ভালবাসি, আমি তার জন্যে গর্বিত , কিন্তু আমার গর্ব ভেংগে যায় যখন আমার মাথায় এটি আসে যে, কত কয়েক দশক ধরে এটি তার জনগনের কল্যানে বা পৃথিবীর কল্যানে কি করেছে?
২০১৪ সালে যখন রাশিয়া ক্রিমিয়া বাড়াল, আমার তখন বুঝার বয়স হয়নি, বুঝতে পেরেছিলাম এটি ভুল ছিল, রাশিয়ান সরকারের এই কাজে নিজেকে দায়ী মনে হল।
অথচ শীতকালীন অলম্পিকে যখন রাশিয়া পদক জিতল আমি নিজেই জেতার মত খুশি হয়েছিলাম।

কত কয়েক বছর যাবত রাশিয়ার আচরণ আর আগ্রাসন পুরো ইউরোপ জুড়ে তাদের নিন্দা ও ঘৃণার চোখে দেখছে।

আমি ইংল্যান্ডে পড়ালেখার সময়ে তা হারে হারে বুঝতে পেরেছি, আমি পারছিনা জোরে জোরে বলতে যে, আমি পুতিনকে ভোট দেয়নি, আমি এই সরকার সমর্থন করিনা।
মালয়েশিয়ান প্লেনকে গুলি করে উড়িয়ে দিয়ে আবারও আমাদের লজ্জায় ফেলে দিল এর কিছুদিন পরেই।

ক্রিমিয়া বৃদ্ধির সময়ে আমি লন্ডনে ট্যাক্সি নিয়ে বিমানবন্দরে যাচ্ছিলাম, ভাড়া নিয়ে আমি চিন্তিত হলাম, রাশিয়ার রুবল পাউন্ড আর ডলারের বিপরীতে বেড়ে চলছে, ১ পাউন্ড হল ১১৫ রুবল, ৩ মাসের মধ্যেই ১৫৫ পারসেন্ট বেড়ে গেল।

সরকার যে কাজ করল তাতে আমাদের আর নিয়ন্ত্রণ থাকল না, শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত আর ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
রাশিয়াতে আমাদের পর্যটন ব্যাবসা ভেস্তে গেল, আমার পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া দুর্বিষহ হয়ে উঠল, লন্ডনে আর থাকতে পারব কিনা আমি জানি না।

খাবারের চরম সংকট।
রাশিয়ার অর্থনীতি আর দাড়াতে পারেনি, কিন্তু আমাদের জীবন থেমে নেই, জীবন দিনে দিনে কঠিন হয়ে গেল।

আর ইউক্রেনে আক্রমণের পর রাশিয়ার অবস্থা আর ও ভয়ানক হয়ে যাবে, এবার আমাদের অনেক পোহাতে হবে।

আমাদের রাশিয়ায় কেউ যুদ্ধ চাইনা।
অনেক মিডিয়া বিশ্বাস করেনি যে পুতিন সত্যি আক্রমণের যাবেন, কিন্তু পুতিন এটি করল একটি সন্ত্রাসী, বিদ্রোহী দলকে উসকিয়ে দিতে।

২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের সকাল বদলে গেল, আর আমাদের সকাল আর ও খারাপ হলো, দুটি ভিন্ন কারনে, যদি ও আমাদের আকাশে বোমা পরার ভয় ছিলনা, কিন্তু আমরা টিভিতে চোখ রেখে গেলাম, পরিস্থিতি দেখতে।

ইউক্রেনবাসীদের মত আমরা রাশিয়ানরাও পুতিনের বলির শিকার হলাম। সারা বিশ্ব আমাদের কাছে থেকে দূরে সরে গেল।
পুরো ইন্টারনেট জুড়ে আমাদের প্রতি ঘৃণা আর নিন্দা।

আমার পার্টনার তার রাশিয়ার নাগরিকত্ব বাতিল করতে চাইছে, কারন কেউ তাকে চাকরি দিতে নারাজ।

সবাই আমাদের সাধারণ জনগণকে এই জন্যে দায়ী করল যে, আমরাই পুতিনকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছি, আমরা চাইলে তাকে সরাতে পারতাম।

জেলেন্সকির নিজেরই প্রশ্ন, রাশিয়ান জনগন কি আসলে যুদ্ধ চাই? আমাদের উত্তর, আমরা কেউ যুদ্ধ চাইনা, কাজিকিস্তানে হউক আর বেলারুশে।

রাশিয়ায় প্রায় ৪০ টি শহরে যুদ্ধ বিরোধী মিছিল হয়েছে, হয়েছেন অনেকেই আটক, আমরা পৃথিবীকে জানাতে চাই, এই সরকার আমাদের প্রতিনিধিত্ব করছেনা।

আমার ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে, প্রতিদিন ইউক্রেনীয়দের দিন কিভাবে কাটছে এই যুদ্ধের ডামাডোলে, সাইরেন শুনে আর আতংকিত হয়ে।

একটি শান্তিপূর্ণ দেশকে কিভাবে আমাদের এই সরকার আক্রমণ করল? সত্যিই বলছি, আমরা নিজেরাই পুতিনের বলির শিকার, আমাদের হাত পা বন্ধ, অবশেষে আমার বলতে হচ্ছে, আমি লজ্জিত ও দুখিত যে আমি একজন রাশিয়ান।

 
  
%d bloggers like this: