-বদরুল ইসলাম বাদল

স্বপ্নবাজ একঝাক প্রাণবন্ত নারী উদ্যোক্তাদের আয়োজনে সফল শেষ হল চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক সহায়তায় হস্তশিল্প ও দেশীয় পণ্য উতপাদন উদ্যোক্তা মেলা– 2022।কেন পারবো না? পারতেই হবে এই শ্লোগানের শপথ নিয়ে নিজের সৃজনশীল সৃষ্টি এগিয়ে নেবার উচ্ছ্বাস ভরা দৃঢ়তা উদ্যোক্তাদের।নিজের সৃষ্টির আনন্দ খুব বেশি উপভোগ্য হয়,তখনই যখন বহুবিধ বাধা মাড়িয়ে সাফল্য পাওয়া যায়। যার একমাত্র ফোকাস আনন্দাশ্রুর সাথে স্মিত হাসি ।সমাজ, সংসার এবং পরিবার সামাল দিয়ে নিজের প্রতিভায় ক্যারিশম্যাটিক স্বপ্ন বুননের স্বাক্ষর যুদ্ধ জয়ের চাইতে আধো কম নয়।তেমনি চকরিয়া বিজয় মঞ্চ মাঠের নারী উদ্যোক্তা মেলা নারীর প্রতিভা বিকাশের এক অনন্য প্লাটফর্ম । নিজের আবেগ, বিশ্বাস এবং আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। মেলার মাধ্যমে নিজের উদ্যোক্তা মননকে তুলে ধরার সুযোগ।

মেলার প্রথম দিনের সন্ধ্যায় নারী উদ্যোক্তা মেলা দেখার জন্য যাই।সাথে দু-এক বন্ধু ।প্রতিটি স্টল ঘুরে ঘুরে দেখি।সব স্টলে সুন্দর গোছানো পণ্যের পসরা সাজানো। প্রতিটি উদ্যোক্তার চোখে অনাবিল সপ্ন।নিজের সৃজনশীল সৃষ্টি মেলায় তুলে ধরতে পারার জন্য মহাখুশি। মেলাটি সত্যি সত্যিই নারী উদ্যোক্তাদের প্রাণের মেলা। উজ্জীবিত বিশ্বাসের মেলা। স্টলে দেখা যায় প্রতি টি স্টলে প্রাণচঞ্চল নারী উদ্যোক্তাদের সুন্দর মার্জিত ব্যবহার এবং নিজের পণ্যের সুন্দর উপস্থাপনা কাস্টমারদের মেলার প্রতি আরো আগ্রহী করে তুলে।আমার সাথে থাকা একজন বন্ধু দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর ছুটিতে আসেন ।মেলায় ঘুরতে গিয়ে “রাণীর রান্না ঘর” স্টলের সামনে গিয়ে অনেক রকম পিঠাপুলির আইডেম দেখে দাড়িয়ে যায়। জীবনের অনেকটা সময় পরদেশ থাকার কারণে বাঙালি ঐতিহ্যের গ্রামীণ জনপদের মা দাদীর হাতে বানানো পিঠা স্মৃতি থেকে মুছে যায়। নাম পর্যন্ত ভুলে যায়। । তাই সব আইটেম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে এবং সাথে থাকা তার ছোট ছেলেকে দেখায়।ছেলেটা তার প্রবাসে জন্ম নেয়া।এবারই প্রথম দেশে আসা ।তিনি পিঠাপুলি দেখে রোমন্থন করে হারিয়ে যাওয়া শৈশব কৈশোরের গ্রামীণ জনপদের সব স্মৃতি । প্রতিটি পিঠাপুলির আইটেমের সাথে জড়িয়ে যেন মাতৃস্নেহ, বোনের ভালবাসা,ছোট্ট কালের আবেগ। প্রবাসী বন্ধুর কাছে মেলাটি বড় অনুভুতির জায়গা হয়ে যায়।”রানীর রান্না ঘর” এর কর্মধার আপুটি সব আইটেম সুন্দর ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।তখন আমার বন্ধুটি প্রবাস জীবন থেকে আতিক্কা এসে “আতিক্কা পিটা” সহ আরো কিছু আইটেম নিয়ে কৃতজ্ঞতা ভরে ধন্যবাদ জানান রান্না ঘরের কর্ণধার ফাতেমা বেগম রানী আপুকে।মেলায় কয়েক জন উদ্দোক্তার সাথে কথা বলে জানা যায় অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাদের। সামাজিক তিরস্কার,আপনজনের অসহযোগিতা, পারিবারিক বাধা,আর সংসারের দায়িত্বগুলো ভালভাবে পালন করে এই কাজের জন্য সময় বের করতে হয়।

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার কথা মনে পড়ে যায়। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন পুরো নামটি বলা না হলে মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার জাগরণের ব্যাখ্যা টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।কারণ স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের ঐকান্তিক প্রেরণা বেগম রোকেয়াকে সাহসী করে তুলে।সচরাচর দেখা যায় যে,”নারী দিয়েছে সেবা পুরুষ সাজিয়েছে মহান”(জৈনক লেখক)।নারীর সেবা ভালবাসা এবং সহযোগিতাই সফল পুরুষের প্রচ্ছন্ন শক্তি। চিন্তাবিদ ওহেনরীর মতে,”সব সফল বড় মানুষের সাফল্যের জন্য কোন অসাধারণ নারীর সহযোগিতা এবং উত্সাহের ঋণের কথা বলেছেন”।তেমনি ভাবে প্রতিজন পুরুষ যদি তাদের পাশের নারীর প্রতি সহযোগিতা করে সে নারীর ভিতরের প্রতিভার বিকাশের পথ সহজ হয়। হস্তশিল্প সংগঠনের সভাপতি শারমিন জন্নাত ফেন্সির সাথে কথা বলে বুঝা যায় তিনি শুধু নিজে স্বপ্ন দেখেন না, সমমনা অন্য নারীদের সুপ্ত সপ্নগুলোকে জাগিয়ে তুলতে যথা সাধ্য চেষ্টা করছেন। কথায় কথায় তিনি তার এ অবস্থানে আসার জন্য স্বামী সজ্জন সাংবাদিক আবুল মনসুর মোঃ মহসীনের সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন। স্বামী পাশে আছে বলেই তিনি তার লড়াকু পথচলার সফলতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। । তাই মনে করি নারীদের সহযোগিতা করলে তাদের দ্বারা অনেক কিছু করা সম্ভব।দার্শনিক মতামতে,”একজন সফল উদ্যোক্তা সব সময় পরিবর্তনের জন্য কাজ করে, সুযোগে অনুসন্ধান করে এবং প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগায়।”সংগঠনের সভাপতি শারমিন জান্নাত ফেন্সি দৈনিক যুগান্তরে এক সাক্ষাৎকারে জানান 2020 সালে উপজেলার বিভিন্ন জায়গার 30 জন নারী উদ্দোক্তা নিয়ে যাত্রা করা এই সংগঠনের সাথে বর্তমান 325 জন উদ্যোক্তা তাদের নিজেদের তৈরি পণ্যের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিন দিন ব্যাপী মেলা2022 এ সেনাবাহিনীর একটি স্টল সহ মোট 35টি স্টলে হস্তশিল্প এবং দেশীয় পণ্যের বিশাল সমাহার হয়েছে।যাদের সহযোগিতায় মেলাটি সুন্দর সফল হয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক আবুল মনসুর মোঃ মহসীন।বিশেষ করে উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী।পৌরসভা মেয়র আলমগীর চৌধুরী,চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী। এডভোকেট ফয়জুল কবির এবং রাজিফুল মোস্তফা চৌধুরী।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের দুর্দান্ত যাত্রা।নারী উদ্যোক্তাদের দেশীয় পণ্যের উতপাদন অর্থনৈতিক অবস্থান কে আরো বেগবান করবে। কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের। অনেকে তার ছেলে সন্তানের সহযোগিতা করতে পারবে।সংসারের বিপদ-আপদ কালীন সময়ে হাল ধরার সুযোগ পাবে। অর্থনৈতিক ও সমাজ সচেতন মহলের ধারণা, উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শনীর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত কিছু আয়োজন করা যেতে পারে। খুবই কম খরচে বছরে দু-তিন বার স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় মেলার আয়োজন করতে পারলে ভালো হয়।আর কমপক্ষে একবার ফ্রীতে মেলায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেবার অনুরোধ থাকবে।সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা দরকার।প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতেই পারে। তাতে সৃষ্টি হবে নতুন উদ্যোক্তা এবং নতুন গ্রাহক।আর পণ্যের মান যাচাইয়ের সুবিধা হবে খরিদদার ।ফলে বহুল প্রচার প্রসার পাবে নারী উদ্যোক্তা ব্যবসা।আর পণ্যের বিক্রি বেশি হলে উদ্যোক্তাদের লোকসানের ভয় থাকবে না।ফলে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশ গ্রহণ আশাব্যঞ্জক নিশ্চিত হবে। নারী উদ্যোক্তাতাদের সৃষ্টি কর্মে অব্যাহত থাকুক চকরিয়ার হস্তশিল্প মেলা।
জয় বাংলা।

-কলামিস্ট ও সমাজকর্মী,সাবেক ছাত্র নেতা।

 
  
%d bloggers like this: