সিবিএন ডেস্ক:

‘একে তো নাচনি বুড়ি তার ওপর ঢাকের বাড়ি’ প্রবাদটি যেন এখন নিত্যপণ্যের দামের ক্ষেত্রে পুরোপুরি মানানসই। করোনার অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ নিত্যপণ্য। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ অবস্থায় আসছে রমজান উপলক্ষে নতুন করে বেড়েছে আলু, ছোলা, খেজুর, আদা, রসুনসহ বিভিন্ন মসলার দাম, যা স্বল্প আয়ের মানুষদের ভোগান্তি আরও বাড়াবে বলেই আশঙ্কা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকদিন ধরেই চাল, তেল, চিনির দাম বাড়তি। পাশাপাশি আটা, ময়দার দামও বেড়েছে সম্প্রতি। রোজার মাসে যেসব পণ্য বেশি ব্যবহৃত হয়, গত ১৫ দিনে সবগুলোর দাম বেড়েছে। সামনে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে রোজার মাসে ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে সয়াবিন তেল, চিনি ও ছোলা আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে তেল, চিনি, ছোলা ও মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এর মধ্যে এক কোটি ৭১ লাখ ১৫ হাজার ৬৫২ লিটার সয়াবিন তেল, ১৪ হাজার টন চিনি, ১০ হাজার টন ছোলা এবং ১৯ হাজার ৫০০ টন মসুর ডাল ক্রয়ের চারটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৯১ কোটি ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৬ টাকা।

তবে সরকারের এ উদ্যোগ রোজার মাসে ক্রেতাদের কতটা স্বস্তি দিতে পারবে তা এখন দেখার বিষয়। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবির তথ্যে উঠে এসেছে গত এক সপ্তাহে চাল, আটা, ময়দা, পাম অয়েল, মসুর ডাল, ছোলা, আলু, শুকনা মরিচ, আদা, দারুচিনিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোজায় বহুল ব্যবহৃত পণ্য খেজুর ও ছোলার দাম গত কয়েকদিনে বেড়েছে। খুচরা পর্যায়ে ছোলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, যা কয়েকদিন আগে ছিল ৭০-৭৫ টাকা। অর্থাৎ ছোলার দাম এরই মধ্যে কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে।

এ বিষয়ে মালিবাগ হাজীপাড়ার ব্যবসায়ী মো. আফজাল বলেন, রোজা উপলক্ষে এরই মধ্যে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গত কয়েকদিনে ছোলার দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। আমাদের ধারণা শবে বরাতের পর পরই ছোলার দাম আরও বাড়তে পারে।

ছোলার দামের বিষয়ে রাজধানীর মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী শফি মাহমুদ বলেন, আমাদের দেশে ছোলাসহ যেসব ডাল ব্যবহার করা হয়, তার বেশিরভাগই আমদানি করা। দেশের ভেতরে খুবই সামান্য পরিমাণ উৎপাদন হয়। সম্প্রতি ছোলাসহ বিভিন্ন ডালের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। এ কারণে দাম একটু বেড়েছে।

তিনি বলেন, ছোলাসহ অন্যান্য ডালের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো হাত নেই। কারণ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নেপাল, মিয়ানমার, তুরস্ক ও ভারত থেকে আমদানি করা ছোলাসহ অন্যান্য ডাল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়ে প্রথমে খাতুনগঞ্জ বাজারে যায়। সেখান থেকে আসে মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে। খাতুনগঞ্জ দাম বাড়ালে আমাদের এখানে অটোমেটিক দাম বাড়ে। একইভাবে খাতুনগঞ্জে দাম কমলে ঢাকার বাজারেও কমে যাবে।

এদিকে কয়েকদিন আগে খুচরা পর্যায়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বিক্রি হওয়া নিম্নমানের খেজুরের দাম বেড়ে এখন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি, যা কিছুদিন আগে ছিল ২২০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। আর ভালো মানের খেজুরের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা। কিছুদিন আগে এই খেজুরের দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে।

খেজুরের দামের বিষয়ে খিলগাঁওয়ের ব্যবসায়ী মো. মিলন বলেন, আমরা সারাবছর খেজুর বিক্রি করি। খেজুরের দাম প্রায় এক বছর ধরে কম ছিল। তবে এখন বাড়তে শুরু করেছে। কিছুদিন আগে আমরা যে খেজুর ৪০০ টাকা বিক্রি করেছি, তা এখন ৫৫০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ আড়তে খেজুরের দাম বেড়ে গেছে। রোজাকেন্দ্রিক খেজুর এখনো বিক্রি শুরু হয়নি, কিন্তু এখনই দাম বেড়ে গেছে। সামনে বিক্রি বাড়লে দাম আরও বাড়বে এটাই স্বাভাবিক।

এ বিষয়ে বাদামতলী ফলের আড়তের ব্যবসায়ী মো. সুমন বলেন, আমরা ছোট ব্যবসায়ী। এখানে খেজুরের দাম নির্ভর করে কিছু বড় ব্যবসায়ীদের ওপর। তারাই খেজুর আমদানি করেন। আমরা তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করি। তবে শুধু খেজুর না, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এখন আমদানি করা সব পণ্যের দাম বেশি। রমজানে দাম আরও বাড়তে পারে। কারণ আমদানি করা যেসব পণ্য রমজানে আমাদের বাজারে এসে পৌঁছাবে, তার সবগুলোর আমদানি খরচ বেশি পড়বে।

ছোলা, খেজুরের পাশাপাশি দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে রসুন, আদা, হলুদসহ বিভিন্ন মসলা। কিছুদিন আগে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া দেশি রসুনের দাম বেড়ে এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আমদানি করা রসুনের দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা, যা কয়েকদিন আগে ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা।

একইভাবে দেশি আদার কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা, যা কয়েকদিন আগে ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে। জিরার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, যা কিছুদিন আগে ছিল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। হলুদ গুঁড়ার (খোলা) কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা, যা আগে ছিল ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। কিছুদিন আগে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া শুকনা মরিচের দাম বেড়ে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

দাম বাড়ার এ তালিকায় রয়েছে আলুও। কিছুদিন আগে ১৫ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া আলুর দাম বেড়ে এখন ২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া তেল ও চিনি আগে থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি চিনি কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৮৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের কেজি ১৯০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।

রোজা উপলক্ষে কারওয়ানবাজারে কেনাকাটা করতে আসা মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, এখনই সবকিছুর দাম বাড়তি। রোজার আগে আরও দাম বাড়বে এমন আশঙ্কায় আছি। তাই একটু আগেই রোজার কেনাকাটা করে রাখছি। কারণ আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা তো ভালো না। এর আগে দেখেছি মুনাফালোভী এক শ্রেণির ব্যবসায়ী রোজা উপলক্ষে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। এবারও সেসব পণ্যের দাম আরও বাড়বে না, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে?

তিনি বলেন, জিনিসপত্রের যে দাম তাতে কেউ স্বস্তিতে নেই। চাল, ডাল, তেল, চিনির যে দাম তাতে অধিকাংশ মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চবিত্ত ছাড়া কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ ভালো নেই। টিসিবির ট্রাকের দিকে তাকালেই বোঝা যায় মানুষ কত কষ্টে আছে। হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য কিনছে। কষ্টে না থাকলে কেউ এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতো না।

মতিঝিলে কথা হয় রিকশা চালক মো. জয়নালের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখন আমাদের জন্য কোনোরকম খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই বড় বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। রোজা নিয়ে ভাবার সময় কোথায়। এখন দু’বেলার বেশি খাই না। রমজানেও কোনো রকমে সেহরি খেয়ে রোজা রাখবো। আর ছোলা-মুড়ি দিয়ে ইফতারি সেরে নেবো।

চাল, আটার দাম আরও বেড়েছে:
দীর্ঘদিন ধরেই চড়া দামে বিক্রি হওয়া চাল ও আটার দাম নতুন করে আরও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে চালের দাম কেজিতে তিন থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে ৬২ থেকে ৬৪ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া চিকন চালের দাম বেড়ে এখন ৬৬ থেকে ৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। মোটা চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৪ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। আর মাঝারি মানের চালের দাম বেড়ে ৫৬ থেকে ৬০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫৪ থেকে ৫৬ টাকার মধ্যে।

অপরদিকে খোলা আটার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকা। যা কিছুদিন আগে ছিল ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। আর ৪২ থেকে ৪৫ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া খোলা ময়দার দাম বেড়ে এখন ৫০ থেকে ৫২ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

চাল, আটা ও ময়দার দাম বাড়ার এ চিত্র উঠে এসেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবির তথ্যেও। টিসিবি জানিয়েছে, গেলো এক সপ্তাহে চিকন চালের দাম বেড়েছে এক দশমিক ৫৪ শতাংশ। এছাড়াও মাঝারি মানের চালের দাম তিন দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম দুই দশমিক ১৩ শতাংশ বেড়েছে। খোলা আটার দাম বেড়েছে সাত দশমিক ১৪ শতাংশ। একই সঙ্গে খোলা ময়দার দাম এক দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ বেড়েছে।

মধ্য বাড্ডার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, গত কয়েকদিন সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। রশিদের চাল বস্তায় বেড়েছে ৩০০ টাকা। এভাবে সব কোম্পানির চালের দাম বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে বেড়েছে। এছাড়া আটা, ময়দার দামও গত কয়েকদিনে বেড়েছে। এবছর রমজানে জিনিপত্রের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা জানি না। জিনিপত্রের দাম বাড়ায় শুধু ক্রেতারা নয়, আমরাও কষ্টে আছি। একদিকে আমাদের লাভ কম হচ্ছে, অন্যদিকে বিক্রি কমে যাচ্ছে।

 
  
%d bloggers like this: