মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

ইয়াবা টেবলেট বহনের মামলায় আসামীকে সাজা হিসাবে কারাদন্ডের পরিবর্তে এক বছরের প্রবেশন দিয়েছেন আদালত। প্রবেশনে সদাচরণ ও ভালো কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ গত ২৮ জুলাই এ রায় ঘোষণা করেন।

মামলায় প্রবেশনে প্রেরিত আসামী টেকনাফের সেন্টমার্টিনের বাজারপাড়ার মৃত সিদ্দিক আহমদ ও আমেনা খাতুনের পুত্র ইমাম হোসেন চিশতি (৪৯)। তার বর্তমান বাড়ি চট্টগ্রাম শহরস্থ চট্টগ্রাম পোর্টের বিএন ওমর ফারুক এর সেইলর্স কলোনীতে। রায় ঘোষণার সময় আসামী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আদালতে রাষ্ট্র পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট আহমদ কবির এ তথ্য জানিয়েছেন।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ :
২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারী ১২ টা ৪৫ মিনিটের দিকে কোষ্ট গার্ডের সেন্টমার্টিন স্টেশনের একটি টিম এক অভিযান চালিয়ে সেন্টমার্টিন ব্রীজঘাট থেকে ইমাম হোসেন চিশতি নামক একজনকে আটক করে। পরে আটককৃত ব্যক্তির দেহ তল্লাশি করে কোটের পকেট থেকে পলিথিন মোড়ানো অবস্থায় ৬০ পিচ ইয়াবা টেবলেট উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় কোস্ট গার্ডের সেন্টমার্টিন স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট (বিএন) আরীফ হোসেন বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১) এর ৯(খ) ধারায় ইমাম হোসেন চিশতিকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। যার টেকনাফ থানা মামলা নম্বর : ০১/২০১৪ ইংরেজি, জিআর মামলা নম্বর : ৪৪/২০১৪ ইংরেজি (টেকনাফ) এবং এসটি মামলা নম্বর ৭৮৮/২০১৪ ইংরেজি।

বিচার ও রায় :
মামলাটি বিচারের জন্য কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর চার্জ (অভিযোগ) গঠন করা হয়। মামলায় ৪ জনের সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, আসামী পক্ষে জেরা, আলামত প্রদর্শন, যুক্তিতর্ক সহ বিচারের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

এ অবস্থায় বিজ্ঞ বিচারক অপরাধের মাত্রা অপেক্ষাকৃত লঘু বিবেচনায় টেকনাফ উপজেলা প্রবেশন অফিসারের কাছে আসামীর জীবনযাত্রা সহ সার্বিক বিষয়ে প্রতিবেদন তলব করেন। প্রবেশন অফিসার তার প্রেরিত প্রতিবেদনে আসামী ইমাম হোসেন চিশতির পরিবারকে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার, সেন্টমার্টিনে দোকান ভাড়া দিয়ে সংসার চালান। তার স্বভাব চরিত্র ভালো। স্ত্রী এবং ৩ কন্যা সন্তান নিয়ে কোন রকমে জীবন যাপন করেন। তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি। আসামী ইমাম হোসেন চিশতিকে আদালত সাজা দিলে তার পরিবারের সদস্যরা আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মর্মে প্রবেশন অফিসার তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। আসামীকে শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে প্রবেশনে মুক্তি দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দিতে আদালতে প্রাবেশন অফিসার মতামত দেন।

বিজ্ঞ বিচারক প্রাবেশন অফিসারের মতামত বিবেচনা করে আসামী ইমাম হোসেন চিশতিকে ইয়াবা টেবলেট বহনের দায়ে শাস্তি নাদিয়ে ১৯৬০ সালের প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স এর ৫ ধারা অনুযায়ী আসামীকে পরবর্তী এক বছরের জন্য প্রবেশন দেন। প্রবেশনের শর্ত অনুযায়ী আসামীকে ২০ হাজার টাকা বন্ডে ২ জন জাতীয় পরিচয়পত্রধারীর জিম্মায় দেওয়া হয়। আসামী নতুন কোন অপরাধে জড়াতে পারবেন না। আসামীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে প্রতিমাসের প্রথম ও তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশন অফিসারের কাছে হাজিরা দেবেন। প্রবেশন অফিসার ও সংশ্লিষ্ট থানার ওসি তিন মাস অন্তর অন্তর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

প্রবেশনের এক বছর পর অর্থাৎ ২০২৩ সালের ২৭ জুলাই প্রবেশন শেষ হবে। এরমধ্যে, আসামীর বিরুদ্ধে প্রাবেশন এর শর্ত ভঙ্গ করার কোন অভিযোগ পেলে ১৯৬০ সালের প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স এর ১১ ধারা অনুযায়ী প্রবেশন বাতিল করে আসামীকে ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১) এর ৯(খ) ধারার বিধান মতে শাস্তি প্রদান করা হবে। পরে প্রবেশন আদেশের শর্ত অনুযায়ী আসামী ও তার জিম্মাদারগণ আদালতে লিখিত অঙ্গীকারনামা দেন।

প্রবেশনের বিষয়ে আসামী ইমাম হোসেন চিশতি বলেন, বিজ্ঞ বিচারক তাকে শাস্তি নাদিয়ে, যে বদান্যতা দোখিয়েছেন, তা আমি ও আমার পরিবারের জন্য বিশাল প্রাপ্তি। শাস্তি দিলে তার তিন কন্যা স্ত্রী সহ পুরো পরিবার তছনছ হয়ে যেত উল্লেখ করে আসামী ইমাম হোসেন চিশতি বলেন, একজন বিচারক যে, কত মানবিক ও বিচারিক গুনাবলীসম্পন্ন হতে পারেন-তার উজ্জল দৃষ্টান্ত হচ্ছে- কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ। তিনি বলেন, সাজা ভোগ করার আতংকে রাতে আমার ঘুম হতোনা। আমাকে প্রবেশন দেওয়ার ফলে আমি এখন নিয়মিত পেশার মাধ্যমে সংসার চালিয়ে যেত পারবো।

আদালতে রাষ্ট্র পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট আহমদ কবির বলেন, প্রবেশনমূলক রায়ের ফলে একজন মানুষ নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ পেয়েছে এবং তাতে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবার নির্ভয়ে ও সাবলীলভাবে চলতে পারবে।

আসামীর জিম্মাদার ইউপি সদস্য মোঃ আল নোমান আসামীকে শাস্তির পরিবর্তে প্রাবেশন দেওয়ার বিষয়ে বলেন-এটা আমার নতুন অভিজ্ঞতা। এতে প্রমাণ হয়েছে, অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের জন্য শুধু কারাদন্ড দিয়ে শাস্তি নয়, আইনের আওতায় মানবিক শাস্তিও দেওয়া যায়। যা প্রয়োগ করে কক্সবাজারের বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাঁর মেধা, দূরদর্শিতা ও অসাধারণ বিচারিক গুনাবলীর প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যা নিঃসন্দেহে অনুসরণযোগ্য। এ রায়ে আসামী দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার সুযোগ নিতে পেরেছে।

আসামী ইমাম হোসেন চিশতি’র স্ত্রী শোকরিয়া জ্ঞাপন করে বলেন, বিজ্ঞ বিচারক শাস্তির পরিবর্তে প্রবেশন দেওয়ায় আমার পুরো পরিবার যেন, আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি। শাস্তি দিলে আমার স্বামী একমাত্র উপার্জনকারী হিসাবে আমার পুরো পরিবার হয়ত নিচিহ্ন হয়ে যেতাম।

 
  
%d bloggers like this: