ইমাম খাইর, সিবিএনঃ
কক্সবাজারে বন আদালত গঠন ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে রেকর্ড হয়েছে। মাত্র তিন মাসে ১৩০ টি মামলার রায় হয়েছে। সহজে জামিন পাচ্ছে না আসামিরা। বয়স্ক আসামিদের সাজার পরিবর্তে প্রবেশনে প্রেরণ করেন বিচারক। তাতে মামলার জট অনেকাংশে কমে এসেছে। আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট বাদি-বিবাদীপক্ষ।
চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সুত্রে জানা গেছে, গত ২০ মার্চ আলাদা বন আদালত গঠন করা হয়। প্রথম মাসেই ৩৬ টি মামলা নিষ্পত্তি করেন বন আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মোঃ আসিফ। এছাড়া পরের মাস এপ্রিলে ৩৩ টি, মে মাসে ৪৭ টি এবং জুনে ৫০ টি বন মামলা নিষ্পত্তি করেন। মামলার রায়ে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রদান করেন। বয়স্ক আসামিদের সাজার পরিবর্তে প্রবেশনে প্রেরণ করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন বিচারক।
চকরিয়া, কুতুবদিয়া এবং মহেশখালী ব্যতিত সকল বন মামলা বন আদালতে প্রেরন করে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মোঃ আসিফকে দায়িত্ব প্রদান করেন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর মুহাম্মদ ফারুকী।
বন আদালতের বেঞ্চ সহকারি মোহাম্মদ শফি বলেন, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মোঃ আসিফ বন আদালতের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বনের অপরাধ বহুলাংশে কমে গেছে। বিচারকের দৃঢ়তায় আসামিরা সহজে জামিন লাভ করতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে আসামিদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। এতেকরে বনের অপরাধ বহুলাংশে কমে গেছে মনে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বন মামলার আসামিদের জামিনের পরিবর্তে এই পর্যন্ত তিন হাজার বৃক্ষরোপনের নির্দেশ প্রদান করেছেন। বিচারকের নির্দেশে নির্ধারিত এলাকায় বৃক্ষরোপণ করছে বন বিভাগ। এতে করে বনাঞ্চল আবার সবুজ সমারোহে পরিণত হচ্ছে।
বেঞ্চ সহকারি মোহাম্মদ শফি বলেন, বনের সংরক্ষিত এবং রক্ষিত উভয় অঞ্চল রক্ষায় সরকারের সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে আদালত।
সংশ্লিষ্ট সুত্র বলছে, পূর্বে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিভিন্ন এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটগণ তাদের নিজ নিজ অধিভুক্ত এলাকায় মামলা আমলে গ্রহন এবং বিচার সম্পন্ন করতেন। এতে করে ভিন্ন ভিন্ন আদালতের ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং দ্রুত বিচার নিষ্পত্তিতে সমস্যা হত। বর্তমানে পৃথক বন আদালতের সুবাধে আগের জটিলতা নেই। নিজস্ব গতিতে চলছে বিচারের কাজ।
বন বিভাগের প্রসিকিউটর এফসিসিও মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট তার আমলি আদালতের দায়িত্বের পাশাপাশি বন আদালতের বন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তাতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। অনেক দিনের মামলা জট কমে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম বলেন, বন আদালত পৃথক হওয়ার পর বনের প্রচুর উপকার হচ্ছে। গ্রহণযোগ্য ও সুন্দর রায় দিচ্ছেন বিচারক। আদালতের নির্দেশনা ও আদেশের আলোকে প্রতিবেদন দাখিল করছি। তিনি বলেন, বনভূমি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নতুন বনায়নের ভূমিকা পালন করছেন আদালত।
কক্সবাজার আদালতের আইনজীবি সমিতির সভাপতি ইকবালুর রশীদ আমিন (সোহেল) বলেন, আসাদ উদ্দিন মোঃ আসিফ বন আদালতের দায়িত্ব গ্রহন করার পর থেকে কক্সবাজার জেলায় বনের অপরাধ বহুলাংশে কমেছে। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে। তাতে জীববৈচিত্র এবং জলবায়ু রক্ষায় এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করছেন আদালত।
তিনি বলেন, বনাঞ্চল রক্ষার দায়িত্ব সকলের। এক্ষেত্রে বন রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি জনগনকে অনবদ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। নতুবা বৈষ্ণিক উষ্ণতাসহ জলবায়ুর পরিবর্তন মানব সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
নির্ভরযোগ্য একটি সুত্রে পাওয়া তথ্য হলো, বাংলাদেশে মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। কিন্তু বিগত দশক থেকে যে হারে বনভূমির জায়গা দখল করে পাহাড়ের মাটি কেটে বাড়ি নির্মান, গাছ কেটে ফেলা এবং কাঠ অপসারনসহ বনের বিভিন্ন অপরাধ সংঘটন করছে এতে জীববৈচিত্র যেমন ধ্বংসের মুখে ঠিক তেমনি দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতেকরে জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশে সংরক্ষিত এবং রক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে কক্সবাজার পর্যটন অন্যতম একটি এলাকা। এই এলাকায় রোহিঙ্গা জনবসতি স্থাপনের পূর্বে থেকেও সংরক্ষিত এবং রক্ষিত বনাঞ্চল উভয় সমানে ধ্বংস করা হচ্ছে।
বিশ্ব ব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কক্সবাজার এলাকায় মোট বনভূমির মাত্র ১০ শতাংশ রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। বাকি ৯০ শতাংশ বনভূমি ধ্বংসে জড়িত রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সুত্রগুলো বলছে, বনভূমি জবর দখল ও বিক্রিতে স্থানীয় চিহ্নিত প্রভাবশালী মহল জড়িত। যার ভাগ যায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের হাতে। আবার দখলদার উচ্ছেদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন বনকর্মীরা। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে উল্টো বড় নেতাদের হুমকি ও বাধার মুখে পড়তে হয় বন বিভাগকে।

 
  
%d bloggers like this: