সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনে ফুটবল ফেডারেশনকে জমি বরাদ্দ দেওয়াকে ‘সংবিধান ও আইনের লঙ্ঘন’ বলেছেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বলেছেন, এর বাস্তবায়ন হলে সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে। তাই এই বরাদ্দ বাতিলের পাশাপাশি বন-বিধ্বংসী সব কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

২০ জুলাই বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কক্সবাজারের মোট বনভূমির এক-তৃতীয়াংশ (৭৬ হাজার ৯৮৬ একর) ইতিমধ্যেই সরকারি ও বেসরকারিভাবে বেদখল হয়ে গেছে।

এমন অবস্থায় বাফুফের জন্য নতুন করে বনের জমি বরাদ্দ দেওয়া খুবই অসংবেদনশীলতার পরিচয়। টেকনিক্যাল সেন্টারটি উপযুক্ত অন্য স্থানে করতে বলা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রামে জেলার বিভিন্ন অংশে থাকা ১০ লাখ ৮ হাজার ৭৬৮ একর অকৃষি খাসজমির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আক্ষেপ করে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে একটি গাছের পেছনে লাখ টাকা খরচ করা হয়, এটি গাছ মারা গেলে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হয়। সবচেয়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল দেশে, সবচেয়ে বড় উন্নয়নের কাজ হচ্ছে বন তৈরি করা। আর সৃষ্টিকর্তা, প্রকৃতি আমাদের যে সম্পদ অঢেল দিয়েছেন, সেটিকে ধ্বংস করা হলো আমাদের কাজ।’

কক্সবাজারের বনে জমি বরাদ্দ দিলে ভূমিদস্যুরা উৎসাহিত হবে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেনতেন যুক্তিতে যখন সংরক্ষিত বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তখন আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন হয়—এটি স্পষ্ট। সরকার যখন সংবিধান ও আইন লঙ্ঘন করে, তখন মানুষের কাছে ভুল বার্তা যায়। এতে ভূমিদস্যুরা উৎসাহিত হয়, তারা সুরক্ষা পায়। কক্সবাজারের বনভূমির এক-তৃতীয়াংশ দখল হয়ে যাওয়ার দায় সরকারকে নিতে হবে।

নিজেকে ফুটবলপ্রেমী দাবি করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা চাই বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ফুটবলের উন্নতি হোক, সে জন্য টেকনিক্যাল সেন্টারের প্রয়োজন আছে, আমরা চাই সেটি হোক। কিন্তু বিকল্প জায়গা থাকা সত্ত্বেও কেন ওই জায়গাতেই সেন্টার করতে হবে?’ বন ধ্বংস করা ফুটবল খেলার মৌলিক নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে তিনি জানান।

ফিফা যাতে বাফুফের এই সেন্টার নির্মাণে বিনিয়োগ না করে, সে জন্য ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফিফার বিনিয়োগ যাতে পরিবেশ-প্রতিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি না করে, সে ব্যাপারে তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনবোধে সরাসরি ফিফার কাছেও যাব, ফিফা অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। আমি আশা করব, সরকার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নিজেদের এমন একটি বিব্রতকর অবস্থায় নেবে না যে এটি অনুমোদন পাওয়ার পর ফিফা বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়ায়।’
বনের জমিতে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকে ‘নেশা’ হিসেবে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এটি একটি নেশা যে পর্যটননগরীতে প্রত্যেকেই গিয়ে সেন্টার খুলব, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে রেস্টহাউস খুলব, এরপর সেখানে গিয়ে অবকাশ যাপন করব।’ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কীভাবে এক কলমের খোঁচায় ২০ একর জমি দিয়ে দিতে পারে, প্রশ্ন করেন তিনি। বিষয়টিকে চরম অসংবেদনশীলতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন অধিদপ্তরের আপত্তি না শুনে এই জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাহলে বন অধিদপ্তর রাখার দরকার কী? তিনি আরও বলেন, সংবিধানে বলা হচ্ছে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদী, জলাশয়, বন, বন্য প্রাণী রক্ষা করা হবে। সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ভেঙে যদি বন উজাড় করা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছে? কয়েকটি ফিউচার পার্ক, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক! বন উজাড় করার ক্ষতি পূরণ করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনি পাহাড়, সমুদ্র সৃষ্টি করতে পারবেন না। গাছ লাগাতে পারবেন, কিন্তু বন সৃষ্টি করতে পারবেন না।’

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বেসরকারি সংগঠন নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির। তিনি বলেন, বনের সঙ্গে শুধু গাছপালা জড়িত না, এর সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, তাপমাত্রাসহ নানা কিছু জড়িত। দেশ ও জনগণকে রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য তিনি বনের জমি বরাদ্দ না দেওয়ার দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল। তিনি বলেন, কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে উন্নয়ন জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে, তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। কক্সবাজারের বন ধ্বংস হলে ওই এলাকার উষ্ণতা বাড়ার পাশাপাশি বায়ুদূষণ আরও বাড়বে বলে তিনি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন গ্রিন কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কক্সবাজার জেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৬ একর, যার মধ্যে অবৈধ দখলে গেছে ৪৫ হাজার ৯৯০ একর। ৪৩ হাজার ৫৬৮ জন অবৈধ দখলদার ও ৬৯৬টি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে এই বনভূমি দখল করেছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য ৬ হাজার ১৬৪ একর বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে, সরকারের সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আরও ১৪ হাজার ৩৭২ একর। বন বিভাগ সরেজমিনে তদন্ত করে বাফুফের ‘টেকনিক্যাল সেন্টার’ নির্মাণের জন্য যে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটি দেওয়া সমীচীন হবে না বলেও উল্লেখ করেছিল বলে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) উপপ্রধান নির্বাহী রওশন জাহান মনি, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) উপপরিচালক (আইন) মো. বরকত আলী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন,এএলআরডি, টিআইবি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বেলা, ব্লাস্ট, বাপা, নিজেরা করি, গ্রিন কক্সবাজার, ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস), কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলন ও সেভ দ্য কক্সবাজার।

 
  
%d bloggers like this: