দীপন বিশ্বাস, কক্সবাজার:

মিয়ানমার সামরিক সরকারের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে তৈরি হয়েছে নানামুখী সংকট। তার ওপর স্থানীয়দের অনেকেই হারিয়েছেন ঘর-বাড়ি ও কৃষি জমি। এসবের কারণে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় লোকজন দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এত কিছুর পরও রোহিঙ্গাদের সেদিকে কোন আক্ষেপ নেই। প্রতিদিন তারা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে শিবিরের বাইরে গিয়ে চুরি-ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অস্ত্র, মাদকদ্রব্য পাচারসহ ইত্যাদি অপরাধ করে পুনরায় শিবিরে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

চলতি জুন মাসে তারা আরও বেশি বেপরোয়া ও হিং¯্র হয়ে পড়েছেন। ইতোমধ্যে চলতি মাসেই ঘটেছে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে তিনটি খুনের ঘটনা। এছাড়া এই ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১০জন রোহিঙ্গা। এখন তারা শুরু করেছেন প্রশাসনের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ। মারাত্মক এই হিং¯্রতার থাবায় ক্যাম্পের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে পড়ছে।

মাঝেমধ্যে এসব রোহিঙ্গাদের প্রশাসন ধর-পাকড় করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবী রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্পের বাইরে কোন প্রকারে যেতে না পারে। নির্দিষ্ট গন্ডির ভিতরে যেন তাদের অবস্থান হয়। এজন্য বাড়াতে হবে কঠোর নজরদারি ও ধর-পাকড় অভিযান। এছাড়া ক্যাম্পের অভ্যন্তরে যেসব রোহিঙ্গারা নানা অপরাধ সংঘটিত করছে তাদের তালিকা তৈরী করে চালাতে হবে সাড়াঁশি অভিযান।

সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১৮ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এম ব্লকে ৮ এপিবিএন এর টহল দলকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় অজ্ঞাত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা, পরে আত্মরক্ষায় গুলি ছুড়েন এপিবিএন সদস্যরা। পুলিশের সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলি বিনিময়ের ঘটনা এই প্রথম নয় ইতোপূর্বেও তারা অহরহ এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। গোলাগুলির ঘটনায় এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা পিছু হটলে ঘটনাস্থল থেকে বিদেশি অস্ত্র ও ৪৯১টি তাজাগুলি উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কামরান হোসাইন।

তিনি বলেন, ঘটনার পর ক্যাম্প এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এসব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে বাড়ানো হয়েছে তৎপরতা।

একইদিন কক্সবাজারের টেকনাফের নোয়াপাড়া রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নুরালীপাড়া সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে ৪ টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৪ টি তাজা কার্তুজ উদ্ধার করেছে এপিবিএন পুলিশ। দুপুর ২ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত প্রায় সাত ঘণ্টা এ অভিযান পরিচালনা করে এসব অস্ত্র উদ্ধার করেছে ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ।

১৬ এপিবিএন এর অধিনায়ক এসপি মোঃ তারিকুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৬ – এপিবিএন এর কমান্ডো টিমসহ ৮০ জন সদস্যের একটি টিম বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের নুরালীপাড়া সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় ড্রোনের সাহায্যে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান পরিচালনাকালে পাহাড়ি এলাকায় গুহার মধ্যে অজ্ঞাতনামা ডাকাতদল কর্তৃক লুকিয়ে রাখা ৪ টি দেশীয় তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র (এলজি) ও ৪ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। অভিযান পরিচালনাকালে ডাকাতদের মধ্যে কাওকেই পাওয়া যায়নি। অজ্ঞাত ডাকাত সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, গত ১৫ জুন দিনগত রাত ১টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ক্যাম্প-২ ও ক্যাম্প-৬ এর মাঝামাঝি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিতে সলিম (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়েছেন। নিহত সলিম উখিয়ার ক্যাম্প-২, ওয়েস্ট ব্লক-সি/২ এর আবদু শুক্কুরের ছেলে।

অপরদিকে, গত ৯ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আজিম উদ্দিন নামের এক রোহিঙ্গা নেতাকে (মাঝি) কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এ সময় সৈয়দ করিম (৪০) রহিমুল্লাহ (৩৬) নামের আরো ২ জন রোহিঙ্গা গুরুতর আহত হন। আহতরা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। নিহত আজিম উদ্দিন ওই ক্যাম্পের নেতা।

অন্যদিকে, গত ১০ জুন দিনগত রাতে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালংয়ের ৪ নম্বর ক্যাম্প থেকে মোহাম্মদ সমিন (৩০) নামের এক যুবকের হাত-পা বাঁধা রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। মোহাম্মদ সমিন ওই ক্যাম্পের মধুরছড়ার সি ব্লকের বাসিন্দা। এপিবিএন সূত্র জানায়, ক্যাম্পের বাসিন্দারা সমিনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে এপিবিএনকে খবর দেয়। পরে তাকে ক্যাম্পের হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তার সারা শরীরে আঘাত ও পেটে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

এভাবে একের পর এক খুনসহ সহিংস ঘটনা ও প্রশাসনের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ অনেকটা ভাবিয়ে তুলছে সচেতন এলাকাবাসিকে। তারা মনে করছেন অচিরেই ক্যাম্পের অভ্যন্তরে ও বাইরে অবস্থান রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরী করে সাড়াঁশি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায় তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা দু:সাধ্য হয়ে পড়বে।

 
  
%d bloggers like this: