দীপন বিশ্বাস, কক্সবাজার :
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে খুন, অপমৃত্যুসহ নানা অপরাধ আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অপরাধ, একের পর এক ঘটতে থাকলেও প্রশাসনের ধমন-নিপীরণে কোন কার্যকরী ফল পরিলক্ষিত হচ্ছে না। খুনের মামলায় আসামী গ্রেফতার, ডাকাতি ও ইয়াবাসহ রোহিঙ্গা ধর-পাকড়, মালয়েশিয়া পাচারকালে রোহিঙ্গা উদ্ধার এবং দালাল গ্রেফতার ইত্যাদি অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী রোহিঙ্গাদের নানা সময়ে প্রশাসন গ্রেফতার করলেও কেন জানি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না এমন মন্তব্য করেছেন এলাকার সুশীল মহল। তাদের দাবী রোহিঙ্গারা অপরাধ সংঘটনের পর জেলে গেলেও আইনের নানা ফাঁক-ফোঁকড়ে তারা অল্পদিনের মধ্যেই জেল থেকে বের হয়ে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। যার কারণে এসব অপরাধ থেকে পরিত্রান পাওয়া দু:সাধ্য হয়ে পড়েছে।
সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) দিনগত রাত ১টার দিকে ক·বাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ক্যাম্প-২ ও ক্যাম্প-৬ এর মাঝামাঝি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিতে সলিম (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়েছেন। নিহত সলিম উখিয়ার ক্যাম্প-২, ওয়েস্ট ব্লক-সি/২ এর আবদু শুক্কুরের ছেলে।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক (এসপি) মো. নাইমুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গাদের দুইগ্রæপের মধ্যে বুধবার রাতে গোলাগুলি হয়। তার মধ্যে একটি গ্রæপ ছিল মুন্না বাহিনীর আর অপর গ্রæপটির নাম জানা যায়নি। বালুর মাঠ আর নৌকার মাঠের মাঝামাঝি স্থানে গোলাগুলির একপর্যায়ে সলিম নামে এক রোহিঙ্গার শরীরে গুলি লাগে। গোলাগুলির খবর পেয়ে এপিবিএন ঘটনাস্থলে গেলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে সলিমকে উদ্ধার করে এমএসএফ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত তিনটার দিকে তিনি মারা যান। তিনি আরও বলেন, কী কারণে এই গোলাগুলি এবং কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের ধরতে অভিযান চলছে।
এদিকে, গত ১৪ জুন রাতে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকা থেকে নুর কামাল (২১) নামে এক রোহিঙ্গার মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত নুর কামাল টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি ব্লকের শেড নং ৭৪৩ রুম নং ৫ এর বাসিন্ধা মোহাম্মদ তৈয়ুবের ছেলে। নুর কামাল বিষপান করেছে এমন সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে মোচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এনজিও পরিচালিত একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অপরদিকে, গত ৯ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে ক·বাজারের উখিয়ার ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আজিম উদ্দিন নামের এক রোহিঙ্গা নেতাকে (মাঝি) কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এ সময় সৈয়দ করিম (৪০) রহিমুল্লাহ (৩৬) নামের আরো ২ জন রোহিঙ্গা গুরুতর আহত হন। আহতরা ক·বাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। নিহত আজিম উদ্দিন ওই ক্যাম্পের নেতা। ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ৮ এপিবিএনের পুলিশ সুপার শিহাব কায়সার খান বলেন, একদল দুর্বৃত্ত এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও জবাই করে রোহিঙ্গাদের হেড মাঝি আজিম উদ্দিনকে হত্যা করে। এ সময় তাদের কোপে আরও দুজন গুরুতর আহত হন। ঘটনার পরদিন দিবাগত রাতে মাঝি আজিম উদ্দিন হত্যার মামলায় তিন আসামি গ্রেপ্তার করেছে ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ান (এপিবিএন)। তারা হলো- ক্যাম্প-১৯, ব্লক এ/৮ এর বাসিন্দা মৃত মোঃ সলিমের ছেলে মোঃ হাসিম (৪০), ব্লক- ডি/৬, ক্যাম্প-১৬ এর আব্দুল হাকিমের ছেলে মো: জাবের (৩২) ও ব্লক-সি/৬, ক্যাম্প-১৬ এর মৃত আবুল কাসিমের ছেলে মো: ইলিয়াছ (৪০)। ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মোঃ কামরান হোসাইন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
অন্যদিকে, গত ১০ জুন দিনগত রাতে ক·বাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালংয়ের ৪ নম্বর ক্যাম্প থেকে মোহাম্মদ সমিন (৩০) নামের এক যুবকের হাত-পা বাঁধা রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। মোহাম্মদ সমিন ওই ক্যাম্পের মধুরছড়ার সি ব্লকের বাসিন্দা। এপিবিএন সূত্র জানায়, ক্যাম্পের বাসিন্দারা সমিনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে এপিবিএনকে খবর দেয়। পরে তাকে ক্যাম্পের হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তার সারা শরীরে আঘাত ও পেটে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
উখিয়া উপজেলা সদর রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন, অপরাধে জড়িত রোহিঙ্গারা প্রশাসনের হাতে গ্রেফতারের পর যেন জেল থেকে সহজেই ছাড়া না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এবং কয়েকজনের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি হলে কিছুটা অপরাধ প্রবণতা কমবে।
৮ এপিবিএন অধিনায়ক (এসপি) শিহাব কায়সার খান বলেন, প্রাণপণ দিয়ে আমরা রোহিঙ্গা শিবিরে নানা অপরাধ দমনে কাজ করে যাচ্ছি। দুস্কৃতিকারী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করতে আমরাসহ প্রশাসনের একাধিক বাহিনী মাঠে অক্লান্ত কাজ করছে। আশা করি আমরা যথাশীঘ্র এর সুফল পাবো।

 
  
%d bloggers like this: