• আবদুল্লাহ আল মেহেদী

দেশের জনগণের কাছে প্রাপ্তির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রাপ্তির আশাটা অনেক বড়সড়। দীর্ঘ টানা চৌদ্দ বছরের অধিক সময়ের হিসাব মিলিয়ে তিনি এই আশার জাল বুনেছেন। মনে আক্ষেপও আছে অনেক ! আক্ষেপের মাত্রাটা লম্বা। দলের উঁচু পর্যায়ের নেতাদেরও একই অবস্থা। তাদের চাওয়া-পাওয়া ও প্রাপ্তির হিসাবের সময় এখন এমনটাই মনে হচ্ছে। বিরোধী দল বিএনপি নিয়েও সরকার দলীয় নেতাদের মাঝে চলছে নানান গবেষণা এবং জল্পনা দিচ্ছেন নসিয়ত ও রাজনৈতিক উপদেশ।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার চিন্তাহীন এমন না। বিভিন্ন ফর্মুলা ও ছক কষছেন যা পত্রিকা ঘাঁটলে দেখা যায়। নির্বাচন নিয়ে সরকার চিন্তিত এমনটাই বোঝা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। এছাড়া ব্যর্থতা কোথায় সরকার পরিচালনায় সে প্রশ্ন সরকার প্রধানের। কেন উৎখাত করতে হবে? আমাদের ব্যর্থতা কোথায় তা জানতে চেয়েছেন। তবে শেখ হাসিনার প্রশ্নটা ছিল বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে। গত ৭মে গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সভাপতির সূচনা বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমানই নির্বাচনে প্রহসন ও ভোট কারচুপির কালচার শুরু করেছিল অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কখনো ভোটে পেছনে ছিল না। ভোটপ্রাপ্তির পারসেন্টেজও বেশি ছিল। কিন্তু নানা ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগকে ভোটে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান-এইচ এম এরশাদ-খালেদা জিয়ারা সবাই ক্ষমতায় থাকতে মানুষকে হত্যা করেছে, অর্থ-সম্পদ লুট করেছে, আন্দোলনের নামে খালেদা জিয়ারা জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।’

আগামী জাতীয় নির্বাচনের সময় এগিয়ে এসেছে জানিয়ে এখন থেকেই নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করতে দলের নেতাকর্মীদের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনের আগেই কিছু কাজ করতে হবে। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। বিএনপি-জামায়াতের অতীত ও বর্তমানের কুকর্মগুলো মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হবে। মজার বিষয় হচ্ছে আওয়ামী লীগকে এখনও জামায়াত ফোবিয়া তাড়া করে। জামায়াতকে যদিও নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন ১৮ সালে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর আওতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। দলটির নিবন্ধন নম্বর ছিল ১৪। ২০০৯ সালে হাইকোর্টে দায়ের করা ৬৩০ নম্বর রিট পিটিশনের রায়ে আদালত জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০এইচ ধারা অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়।

তবে বিষয়টাতে আদালতকে ব্যবহার করে সরকার আর এটা স্পষ্ট। ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। তবে আদর্শিক দল হিসেবে জামায়াত শক্ত ও বিএনপির জোটভুক্ত তাই আওয়ামী লীগের এত দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তাটা বেশি মনে হচ্ছে, যদিও বিএনপির সাথে জামায়াতের প্রকাশ্য বন্ধন দৃশ্যমান না তবুও আওয়ামী লীগ চাচ্ছে একটি বিচ্ছিন্ন দল হিসেবে বিএনপিকে দাঁড় করাতে আর জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন দল হিসেবে প্রমাণ করতে। এতে লাভবান হবে আওয়ামী লীগ। লাভের পাল্লাটা আওয়ামী লীগের কারণ দল হিসেবে বৈধতা জামায়াতের থাকলেও নির্বাচনের যাবার উপায় নেই। দ্বাদশ নির্বাচনে জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না যেমন পারেনি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে। নির্বাচনে সুযোগ না থাকায় বিশাল ভোট ব্যাংক বিএনপির বাক্সে পড়বে এমন নিশ্চয়তা এখন নাই, সুতরাং কারচুপির সন্দেহ আর ইলেকশন মেকানিজম থেকেই যায় যেটা ১৮ সালে হয়েছিল।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যোগ্য দলীয় প্রার্থী বেছে নিতে সারা দেশে জরিপ চলছে বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই ইভিএম পদ্ধতি থাকবে। এ নির্বাচন হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ। সবকিছু বিবেচনা করে এবার দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সরকার প্রধান। ৯ মে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুগান্তর অনলাইন। আমি দেখতে চাই, দেশের মানুষের জন্য এত করলাম, দেশের মানুষ আমাকে কী দেয়?” এমন প্রশ্ন রেখেছেন শেখ হাসিনা।

এবার আসি একটু শ্রীলঙ্কা বিষয়ে, শ্রীলঙ্কায় গণবিক্ষোভ সামাল দিতে কারফিউ জারি করা হলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। কারফিউ ভেঙে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে সরকারবিরোধীরা। বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিক্ষোভের তীব্রতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রবল বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান মাহিন্দা রাজাপক্ষে। কিন্তু তাতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ একটুও প্রশমিত হয়নি। বরং বিক্ষোভকারীরা সদ্য পদত্যাগকারী মাহিন্দার বাসভবনে হামলা চালায়। তার বাসভবন প্রাঙ্গণে কমপক্ষে ১০টি পেট্রলবোমা ছোড়া হয় বলে বিদেশি গণমাধ্যম থেকে জানা যায়।

সরকারবিরোধী হাজার হাজার মানুষ ৯ মে রাতভর প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ঘিরে সহিংস বিক্ষোভ করে। মাহিন্দাকে উদ্ধারে শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীকে মাঠে নামতে হয়। ভোররাতের এক অভিযানে তাকে উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর একটি দল। চরম অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শ্রীলঙ্কায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পর্যন্ত দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সব কিছুর অভাবে নাকাল লঙ্কানরা কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজাপক্ষে পরিবারের শাসনের অবসানের দাবিতে বিক্ষোভ করছে। রাজাপক্ষেপন্থীরা সরকারবিরোধীদের ওপর সহিংস হামলা চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এদিনের সহিংসতায় একজন এমপিসহ কমপক্ষে পাঁচজনের মৃত্যু হয়।

কোনো এমপি বা মন্ত্রী যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সেজন্য শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েকে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের (বিআইএ) প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। হামলার শিকার হয়েছেন লঙ্কান পুলিশের সিনিয়র ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (এসডিআইজি) দেশবন্ধু টেন্নাকুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে মারধরের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

কথায় আছে, পেটে খেলে পিঠে সয়। অর্থাৎ, পেটে খাবার থাকলে ভালো, না থাকলেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে মানুষ। শ্রীলঙ্কানদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা সেরকম। স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটি। লঙ্কান অর্থনীতির এমন মৃতপ্রায় অবস্থার জন্য সরকারকেই দুষছে জনগণ। ৯ মে তা হঠাৎই সহিংস হয়ে ওঠে। এদিন শ্রীলঙ্কার মন্ত্রী-এমপিসহ অর্ধশতাধিক নেতার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বাদ পড়েনি দেশটির প্রেসিডেন্টের পৈত্রিক বাড়িও। উত্তপ্ত এ পরিস্থিতির মধ্যে শুধু সরকারের মন্ত্রী-এমপিরাই নন, তোপের মুখে পড়ছেন তাদের সমর্থকরাও। বিক্ষোভকারীদের তাড়া খেয়ে বেরওয়েওয়া লেকে ঝাঁপ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সমর্থকরা। এ ঘটনার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। যা বাংলাদেশে ভাইরাল হয়েছে।

জনরোষ কতটা ভয়াবহ উঠতে পারে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে রাজাপাকসে পরিবার। তাদের পৈত্রিক বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। ছাড় পায়নি মন্ত্রী সানাৎ নিশান্তার বাড়িও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, জ্বলন্ত বাড়িগুলো ঘিরে উল্লাস করছে মানুষজন। প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের চারপাশের এলাকাতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যম ডেইলি মিরর রাজাপক্ষের বাসভবনের সামনে একটি হেলিকপ্টার অপেক্ষা করার ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, কয়েকজনকে বিমানবাহিনীর ওই হেলিকপ্টারে ওঠানো হচ্ছে। তারা মাহিন্দা রাজাপক্ষের পরিবারের সদস্য বলে মনে করা হচ্ছে। টুইটারে ভিডিওটি প্রকাশ করেছে ডেইলি মিরর। আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। কলম্বোতে কারফিউ জারি থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় নেমেছে হাজার হাজার মানুষ। সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরো দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ নিয়ে বেশ মাতামাতি হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের ভবিষ্যৎ এমন হবে বলছেন নেটিজেনরা। শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশের ভাগ্য এমন হোক এটা আমি চাই না। আমি চাই না বাংলাদেশ দেউলিয়ার তকমা পাক। কামনা করি না লাল সবুজের বাংলা ভাগ্য বরণ করুক শ্রীলঙ্কার মতো। যদিও আমরা ভালো নেই। ক্ষমতাসীনদের দুঃশাসনে বাংলাদেশের অবস্থা সুখকর না। ঋণের বোঝা সাধারণ নাগরিকের ঘাড়ে। অর্থনীতি অবস্থা ভালো তাও না। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। মেগা প্রকল্পগুলো নাগরিক জীবনে তেমন কাজে দিচ্ছে না বরং মেয়াদ ও অর্থ বাড়ছে।

যাই হোক প্রধানমন্ত্রীর আক্ষেপ ও প্রাপ্তির বিষয়ে আসি এবার। তার বাসনা ও কামনা জনগণের কাছে অনেক। কামনা করা দোষের কিছু না। তিনি চাইতেই পারেন, অধিকারও রাখেন। যেমন করে ৯৬ সালে গণভবন দাবি করেছিলেন। তিনি গিভ এন্ড টেক-এ বিশ্বাসী, আগামীতে দ্বাদশ নির্বাচন নিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন না আওয়ামী লীগ! গোয়েন্দা রিপোর্ট ও মাঠ পর্যায়ের অবস্থা ভালো না। সব মিলিয়ে তিনি ও তার দল চিন্তিত। তবুও আশাবাদী ও দাবিদার। দেখা যাক আগামীর ভাগ্য কোথায় নিয়ে যায়? শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীনদের ভাগ্য না হওয়াই সম্মানের।

[email protected]