মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছায় কক্সবাজারকে ইতিমধ্যে আধুনিক, উন্নত ও মডেল জেলা হিসাবে গড়ে তোলার জন্য এখানে উন্নয়নমূলক বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যার ফলে কক্সবাজারে জায়গা জমির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জমি-জমার বিরোধের কারণে মামলা মোকদ্দমার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে, ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য সীমান্ত হয়ে আসা মাদক পাচারের কারণে মাদকের মামলাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য কক্সবাজার বিচার বিভাগ প্রায় এক লক্ষ মামলার ভারে জর্জরিত।

শনিবার ২ এপ্রিল সকালে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে “বিচার বিভাগীয় সম্মেলন-২০২২” এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির স্বাগত বক্তব্যে জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এ কথা বলেন।

জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল আরো বলেন, ইতিপূর্বে জেলায় বিচার বহির্ভূত প্রতিটি হত্যাকান্ডে তিনটি করে যথাক্রমে মাদক, অস্ত্র, হত্যা মামলা করে ফৌজদারী মামলার অধিক্যতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অতি উৎসাহী হয়ে এইরূপ মামলা বৃদ্ধি করে বিচারক ও বিচার বিভাগকে ব্যস্ত করে রাখা হয়েছে। যা বিচার বিভাগের জন্য মোটেও সুখকর নয়। এজন্য বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত ও ব্যাহত হয়।

জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল প্রকৃত অপরাধীদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে, নির্দোষ ও নিরীহদের মামলায় না জড়িয়ে মামলার বিচার কার্যক্রম সুষ্ঠু ও দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।

অতি উৎসাহী না হয়ে, আইনানুগ ও পেশাদারিত্ব দিয়ে প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি উপস্থিত সকলের প্রতি আহবান জানান। জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, মামলা করার উপাদান থাকলেই মামলা দায়ের করা উচিত। তুচ্ছ ও অযাচিত বিষয়ে নাজেনে, নাশুনে হুট করে মামলা দায়ের করার প্রবনতা কমাতে হবে। তিনি মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে সঠিকসময়ে, সঠিকভাবে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করার জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাগণের দপ্তর প্রধানদের নির্দেশনা দেন। জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল আরে বলেন, মেডিকেল সার্টিফিকেট মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যথাযথ মেডিকেল সার্টিফিেট প্রদানে সতর্কতা অবলম্বন করতে চিকিৎসকদের প্রতি তিনি আহবান জানান।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ সাজ্জাতুন নেছা লিপি’র সঞ্চালনায় এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস.এম আব্বাস উদ্দিন এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শনিবার সকাল সাড়ে ৯ টায় শুরু হওয়া জেলা বিচার বিভাগীয় এ সম্মেলনে কোরআন তেলওয়াত করেন সহকারী জজ আবদুল মান্নান, ত্রিপিটক পাঠ করেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীজ্ঞান তঞ্চঙ্গাঁ এবং গীতা পাঠ করেন জেলা জজ আদালতের স্টাফ প্রদীপ চক্রবর্তী।

জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এর দিক নির্দেশনামূলক স্বাগত বক্তব্যের পর সম্মেলনে উপস্থিত বিচারক, বিভিন্ন দপ্তর প্রধান, আইনজীবী সহ আমন্ত্রিত অতিথিরা উম্মুক্ত আলেচনায় অংশ নেন।

সম্মেলনে আলোচকবৃন্দ নিজ নিজ অবস্থান ও দায়িত্ব থেকে সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থার জন্য বিচার বিভাগকে সহায়তাসহ দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেন।আইনজীবীগণ তাদের বক্তব্যে বিচার বিভাগীয় সম্মেলনের আয়োজন করায় সিনিয়র জেলা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল কে ধন্যবাদ জানান।

দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হওয়া এই বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে বিজ্ঞ বিচারকদের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মোহাম্মদ মোসলেহ্ উদ্দিন, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর মুহাম্মদ ফারুকী, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবদুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজীব কুমার বিশ্বাস, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ-১ মাহমুদুল হাসান, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ-২ মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, সিনিয়র জুডিশিয়াল মাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবুল মনসুর ছিদ্দিকী, চকরিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল মাজিস্ট্রেট রাজিব কুমার দেব, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীজ্ঞান তঞ্চঙ্গাঁ, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো: আসিফ, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: সোয়েব উদ্দিন খাঁন, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হামিমুন তানজুন, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আখতার জাবেদ, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম, চকরিয়ার সহকারী জজ জিয়া উদ্দিন আহমদ, টেকনাফের সহকারী জজ মো: ওমর ফারুক, রামু’র সহকারী জজ মো: মাজেদ হোসাইন, মহেশখালীর সহকারী জজ আবদুল মান্নান সহ জেলা জজশীপ ও ম্যাজিস্ট্রেসীতে কর্মরত বিচারকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে কক্সবাজারের বিভিন্ন দপ্তর প্রধানগণের মধ্যে পুলিশ সুপার মো: হাসানুজ্জামান পিপিএম, টুরিস্ট পুলিশের এসপি মোঃ জিল্লুর রহমান, সিআইডি’র এসপি, পিবিআই এর এসপি, এপিবিএন এর এসপি, সিভিল সার্জন ডা: মো: মাহবুবুর রহমান, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, ২ বিজিবি’র অধিনায়কের প্রতিনিধি, ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়কের প্রতিনিধি, র‍্যাব-১৫ অধিনায়কের প্রতিনিধি, জেলা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক, কোস্ট গার্ডের স্টেশন কমান্ডার, জেলা কারাগারের তত্বাবধায়ক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবু সুফিয়ান, উত্তর ও দক্ষিণ এর বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদ্বয়, দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় কক্সবাজার এর উপ পরিচালক, সমাজ সেবা অফিসের প্রবেশন অফিসার, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড. ইকবালুর রশিদ আমিন সোহেল, সাধারণ সম্পাদক এড. মোঃ তাওহীদুল আনোয়ার, জিপি এড. মোহাম্মদ ইসহাক, পিপি এড. ফরিদুল আলম, স্পেশাল পিপি এড. বদিউল আলম ও এড. একরামুল হুদা, সিনিয়র আইনজীবী এড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এড. কামরুল হাসান, এড. মমতাজ আহমদ, এড. নুরুল মোস্তফা মানিক, এড. মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, এড. মুহাম্মদ বাকের, এড. আজম মঈন উদ্দিন, এড. মৃদুল কান্তি পাল, এড. আকতার উদ্দিন হেলালী, এড. সুলতানুল আলম, এড. আবদুর রহিম, এড. সিরাজ উল্লাহ, এড. মোহাম্মদ জাকারিয়া, এড. নুরুল হুদা, এড. জিয়া উদ্দিন আহমদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস. এম আব্বাস উদ্দিন জানান, অতিমারী কোভিড-১৯ কারণে বিগত সালে বিচার বিভাগীয় সম্মেলন অনুষ্ঠান ব্যাহত হলেও শনিবার অনুষ্ঠিত সম্মেলন সুষ্ঠু, সুন্দর ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিও ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক এবং সবাই প্রাণবন্ত পরিবেশে উম্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।

এস. এম আব্বাস উদ্দিন আরো জানান-সম্মেলনের প্রথম পর্ব সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১ টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বে দেওয়ানী ও ফৌজদারী মোকদ্দমার বিচার নিষ্পত্তিতে উদ্ভুত সমস্যা ও বিলম্বের কারণ সমুহ চিহ্নিতকরণ এবং উল্লেখিত সমস্যা হতে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে আমন্ত্রিত অতিথি সহ সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উম্মুক্ত আলোচনার উপর সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়।

মধ্যাহ্ন বিরতির পর একইদিন বেলা ২ টায় সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্ব শুধুমাত্র বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সম্মেলন শুরু হয়ে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত চলে। দ্বিতীয় পর্বে বিজ্ঞ বিচারকগণ নিজ নিজ আদালতের সমস্যা সমুহ তুলে ধরে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং আদালতের কার্যক্রম পরিচালনায় উদ্ভুত সমস্যা সমুহ চিহ্নিত করে সমাধানের উপায় সম্পর্কে উম্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বলে জানান প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস.এম আব্বাস উদ্দিন।

 
  
%d bloggers like this: