মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাবো। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে প্রয়োজনে বাবার মতো জীবন দিয়ে যাবো। রক্ত দিয়ে যাবো।

“উন্নয়নের নতুন জোয়ার
বদলে যাওয়া কক্সবাজার” এ প্রতিপাদ্য নিয়ে বৃহস্পতিবার ৩১ মার্চ সন্ধ্যায় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবনী পয়েন্টে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ উদযাপনের জমকালো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালী যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী এ বক্তব্য রাখেন। জাতীয় পর্যায়ের এ অনুষ্ঠানটি দেশের কয়েকটি স্পটে লাইভ সম্প্রচারিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কক্সবাজারবাসীসহ সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে আমার এটাই প্রতিজ্ঞা যে, যতক্ষণ আমার শ্বাস প্রশ্বাস আছে ততক্ষণ আপনাদের পাশে থেকে, আপনাদের উন্নয়নে কাজ করে যাবো।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে ভার্চুয়ালী যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এফসিএ এমপি, লাবনী পয়েন্টে সরাসরি বক্তব্য রাখেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এমপি, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এমপি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী এমপি, নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা এবং ৩ জন স্থানীয় উন্নয়নের সুবিধাভোগী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,এ দেশের জনগণের মাঝে নিজের বাবা-মা, ভাইকে ফিরে পেয়েছি। আপনাদের মাঝেই হারানো বাবা, হারানো মা, ভাইয়ের স্নেহ ভালোবাসা ফিরে পেয়েছি। কাজেই আপনাদের জন্য জীবনটা দিয়ে দিতে এতটুকু আমি কুণ্ঠিত না। এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে যত বাধাই আসুক, আমরা করে যাবোই। সবাই সুন্দর জীবন পাবে, উন্নত জীবন পাবে।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার কথা স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, যখন ফিরে আসি, বাবা-মা ভাই কাউকে পাইনি। কিন্তু পেয়েছিলাম লাখো মানুষ। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা ছুটে গিয়েছিল। কাজেই তারা সেদিন থেকে আমার আপনজন। এ বাংলাদেশের মানুষ আমার পরিবার, তারাই আমার সব। তাদের জন্যই আমি কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশের মানুষই আমার সব থেকে আপনজন এবং আমার পরিবার হিসেবে আমি মনে করি।

দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে মানুষগুলোকে বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে ভালোবাসতেন, সেই মানুষগুলোর ভাগ্য পরিবর্তন করা, এটাই তো আমার একমাত্র লক্ষ্য। নিজের জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। শুধু একটা কথাই চিন্তা করি যে, দেশের মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, কতটুকু দিতে পারলাম। বাংলাদেশের মানুষ যখন ভালো থাকে। বাংলাদেশের মানুষের মুখে যখন হাসি ফোটে—এটাই তো জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এর থেকে বড় পাওয়া তো আর কিছু নেই।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক বাধা, অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আমাকে চলতে হয়েছে। বার বার আমার ওপর আঘাত এসেছে। আমি কিন্তু পিছিয়ে যাইনি। আমি চেষ্টা করে গেছি, এদেশের মানুষের জন্য, কিছু করে যেতে, এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঠিক যেভাবে আমার বাবার কাছ থেকে বর্ণনা শুনতাম, যেভাবে তিনি বলতেন যে, বাংলাদেশে কীভাবে উন্নতি করবেন, ঠিক সেই কাজগুলিই করে যাওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছি। তারই সুফল আজ দেশবাসী পাচ্ছে। আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। এই মর্যাদা ধরে রেখেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, যেন আমরা উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারি, যেটা জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল।

উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ যে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, এই অগ্রযাত্রা যেন আমরা অব্যাহত রাখতে পারি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। সেই প্ল্যানও আমি করে দিয়েছি। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ করে দিয়েছি। এই বদ্বীপটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলে যেতে।

টানা তিন মেয়াদে দেশের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আজকে বাংলাদেশ, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি ঘর আলোকিত করেছি, শতভাগ বিদ্যুৎ দিয়েছি। বাংলাদেশের কোনো মানুষ গৃহহারা থাকবে না।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা যে মর্যাদা পেয়েছি দেশে বিদেশে আজকে সে মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঙালি চলতে পারে। কাজেই এই চলা যেন থেমে না যায়— এইটুকুই শুধু আমার চাওয়া।

জনগণের আস্থা ও ভালোবাসাই প্রেরণা জানিযে শেখ হাসিনা বলেন, সেই আস্থা-বিশ্বাসটাই হচ্ছে আমাদের থেকে বড় শক্তি। মানুষের বিশ্বাস, মানুষের আস্থা এবং মানুষের ভালোবাসাই আমাদের প্রেরণা।

কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, কক্সবাজারকে ঘিরেই বাংলাদেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।

শুধু বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ পর্যটন এলাকা গড়ে তুলতে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।কক্সবাজারের ভৌগলিক অবস্থানগত সুবিধার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এই কক্সবাজারটাই একসময় প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে যাওয়ার একটা সেতুবন্ধন রচনা করবে।

অনুষ্ঠানে ৬ জন সচিব, কক্সবাজারের সংসদ সদস্যবৃন্দ, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার সহ উর্ধতন কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন।

দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ উদযাপন অনুষ্ঠানটি ২ পর্বে অনুষ্ঠিত হয়।দিনের প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান সকাল ৯ টায় শুরু হয় অতিথিদের আগমনের মধ্য দিয়ে। সকাল ১০ টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন, স্বাগত বক্তব্য, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বিষয়ে ডকুড্রামা, জাতিসত্তার কবি, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা’র কবিতা আবৃত্তি, স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় দেশাত্মবোধক গান ও পল্লী সংগীত, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে স্কুল শিক্ষার্থীদের সংলাপ, স্কুল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পর্ব, স্কুল পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পর্ব।

সান্ধকালিন মূল পর্ব অর্থাৎ ২য় পর্ব শুরু হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় অতিথিদের আগমনের মধ্য দিয়ে। এতে সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন- অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন। এরপর কক্সবাজারের মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গুলোর কার্যক্রম নিয়ে “জোরসে চলো বাংলাদেশ” শীর্ষক প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস এর সঞ্চালনায় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ উদযাপন অনুষ্ঠানটি আতশবাজি ফোটানো এবং ‘ফুয়াদ এন্ড ফ্রেন্ডস’ ও ‘চিরকুট’ এর সংগীতানুষ্ঠানের মধ্যে দিনব্যাপী এই জমকালো আয়োজন শেষ হয়।

 
  
%d bloggers like this: