জালাল আহমদ,ঢাবি প্রতিনিধি:
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে ইদানিং বাংলাদেশের বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ক্যাম্পাসের খাবারের দোকানগুলোতে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তার ভুক্তভোগী হচ্ছে ‌।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়া , হল এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন খাবারের দোকানগুলোতে সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, কয়েকটি হলে খাবারের দাম বেড়েছে। যেসব হলে খাবারের দাম বাড়ে নি,সেসব হলে মাছ এবং মাংসের আইটেমের আকার ছোট হয়ে গেছে। কমে গেছে সবজি,ভর্তা এবং ডালের পরিমাণ। ছোট হয়ে গেছে পরোটার আকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ.এফ. মুজিবুর রহমান গণিত ভবনের নিচতলায় অবস্থিত ‘গণিত ভবনের ক্যান্টিন’।এই ক্যান্টিনে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই খাবারের বাড়তি দাম রাখা হচ্ছে। মুরগি পোলাও বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা। মুরগি সাদা ভাত বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা। মুরগি খিচুড়ি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা।
মাছ ,সাদা ভাত এবং সবজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ক্যান্টিন এবং ক্যাফেটেরিয়া গুলোতে খাবারের সাথে ডাল ফ্রি দেওয়া হলেও এই ক্যান্টিনে ডালের দাম রাখা হচ্ছে। ডালের গুণগত এবং পরিমাণগত মান নিম্নমানের।
ক্যান্টিনে কর্মরত কর্মচারীরা জানান , গণিত বিভাগের কুতুব স্যার (প্রফেসর কুতুব উদ্দিন) তার গাড়ীর ড্রাইভার ফিরোজ কে দিয়ে এই ক্যান্টিনটি চালাই । তবে প্রফেসর কুতুব উদ্দিন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি ৫ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা কমিটির একজন। আমার ড্রাইভার ফিরোজ এই ক্যান্টিনটি তার লোকজন দিয়ে চালাই।
তবে ক্যান্টিনের ইজারাদার ফিরোজ বলেন, বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে আমাদের ক্যান্টিনে খাবারের দাম বেড়েছে।
ক্যান্টিনের দেখভালের দায়িত্বে থাকা
ফলিত গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ শওকত আলী দৈনিক আমার সংবাদ কে জানান, ক্যান্টিনটি এখন অনটেস্টে (প্রস্তুতিমূলক )চলছে। আমরা আপাতত একজনকে দিয়ে চালাচ্ছি। খাবারের মেন্যুর মূল্য এখনো নির্ধারণ করা হয় নি। মূল্য নির্ধারণের সময় খাবারের মানের সাথে দামের সমন্বয় করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজাত খাবারের দোকান হচ্ছে ব্যবসা প্রশাসন ইনস্টিটিউট ভবনের আইবিএ ক্যান্টিন।ক্যাম্পাসের অনেক শিক্ষার্থীরা শখের বসে এই ক্যান্টিনে খেতে আসেন। দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ঢাবির এই ক্যান্টিনেও ।প্রতিটি খাবারের আইটেমের দাম ১০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশাসন কর্তৃক অনুমোদিত খাবারের মেন্যুর মূল্যের দামের তালিকা থেকে বাড়িয়ে ঘষামাজা করে নতুন মূল্যের দাম লিখে দেওয়া হয়েছে।

আইবিএ ক্যান্টিনের পরিচালক ফয়সাল আহমেদ বাবু বলেছেন, বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে আমাদের ক্যান্টিনে খাবারের দাম কিছুটা বাড়াতে হয়েছে। ঘষামাজা করে কেন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা অনুষদের ডীনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিবিএ শিক্ষার্থীদের জন্য ” ফুড কোর্ট “একটি অভিশাপের নাম। প্রতিটি খাবারের দাম উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। দেশের গ্রামাঞ্চল থেকে আসা দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা এখানকার খাবারের স্বাদ পায় না।
দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ঢাবির এই ক্যান্টিনেও। নতুন করে খাবারের দাম নির্ধারণ করে তা অনুমোদনের জন্য ডীন অফিসে পাঠিয়েছে ক্যান্টিনের পরিচালক।
ক্যান্টিনের পরিচালক তৌকির আহমেদ বলেন, বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার কারণে আমরা নতুন করে খাবারের দাম নির্ধারণ করে তা অনুমোদনের জন্য ডীন অফিসে পাঠিয়েছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মোঃ শাকিল মিয়া দৈনিক আমার সংবাদ কে জানান, ” ফ্যাকাল্টির ফুড কোর্টের খাবারের দাম বেশি যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরাছোঁয়ার বাহিরে বলা যায়। নিম্ন -মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে ফুডকোর্টে খাওয়ার মতো তেমন কোন মেন্যু খুঁজে পায় না। মূলত ফুডকোর্টের খাবারের মেন্যুতে সান্ধ্যকালীন কোর্সের চাকুরীজীবি শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য স্পষ্টত প্রতীয়মান। খাবারের মান উন্নত করে শিক্ষার্থীদের বাজেটের মধ্যে খাবারের দাম নির্ধারণ করা হউক”।
তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সামনের খাবারের দোকান, হাকিম চত্বর এলাকার দুটি খাবারের দোকান , জীব বিজ্ঞান অনুষদের খাবারের দোকান, পুষ্টি ও খাদ্য ইনস্টিটিউটের খাবারের দোকান গুলোতে সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, এসব খাবারের দোকান গুলোতে নিজেদের ইচ্ছেমত খাবারের দাম নিচ্ছে দোকানদারেরা। খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ক্যান্টিনের পরিচালক মোহাম্মদ রিপন জানান,দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমরা খাবারের দাম ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা করেছি। আমাদের কাছে বিকল্প উপায় নেই।
শুধু খাবারের দাম নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাসমান চায়ের দোকানে চায়ের দাম বেড়েছে।
টিএসসি এলাকার চায়ের স্টল গুলোতে কাপ প্রতি ৫ টাকার চা এখন বিক্রি হচ্ছে ৮-১০ টাকা।ক্যাম্পাসের যেসব এলাকার চায়ের দাম বাড়ে নি, সেখানে চায়ের কাপে কমে গেছে চিনি এবং আদার পরিমাণ।
টিএসসির চা বিক্রেতা শাকিব জানান, চিনি,তৈল এবং আদার দাম বেড়েছে।তাই আমরা চায়ের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি।

তবে এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব। খাবারের মান এবং দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।এই বিষয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
তার কারণ ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অনেকেই এসব খাবারের দোকান গুলোতে ফাও খায়(বিনামূল্যে খায়)। অনেক খাবারের দোকান থেকে ছাত্রলীগের অনেকেই মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে।

 
  
%d bloggers like this: