ইউসুফ আরমান, মদিনা থেকে:

প্রতিটি মুসলমানের কাছে শিরোমণি প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত মদিনাতুল মুনাওয়ারা আবেগ-আপ্লুত স্থান। সবুজ গম্বুজের দৃষ্টিনন্দন দ্যুতি সবার নজর কাড়ে। হৃদয়ে ভালোবাসার পারদ জাগিয়ে তোলে। নবীপ্রেমের ষোলকলা পূর্ণ করতে রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসার কাঙালরা সেখানে ছুটে যান। সৌদি আরবের বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান হল মসজিদ আল নববি। মুসলমানদের মহানবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর জীবদ্দশায় এই মসজিদের তৈরি করা হয়। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর তিনি তাঁর বাস স্থানের পাশে এই মসজিদটি তৈরি করেন। তিনি নিজেও এই কাজে অংশ নেন। গুরুত্বের দিক থেকে মসজিদ আল হারামের পরেই এর অবস্থান। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ আর সুন্দর মসজিদ। মসজিদ সংলগ্নই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর রওজা মোবারাক অবস্থিত। সেই রওজা মুবারক জিয়ারতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিদেশী মুসলিমের ঢল। কাঁন্নায় জড়িত কন্ঠে দরূদ এ সালাম, দোয়া পড়ে পড়ে বাবে সালাম থেকে প্রবেশ করে অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে দিন রাত সব সময়ের জন্য এই মসজিদ উম্মুক্ত থাকে। হজ্জের সময় আগত হাজীগন হজ্জের পূর্বে অথবা পরে মদিনায় মসজিদে নববির আশে পাশে অবস্থান করে থাকেন। এই মসজিদটি সৌদি আরব সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তারাই এর যাবতীয় সংরক্ষন ও সংস্কারের ব্যবস্থা করেন।

ওহুদ পাহাড় ও প্রান্তরঃ- মদিনা শহরের উত্তরে ১০৭৭ মিটার তথা ৩৫৩৩ ফুট উচ্চতার ওহুদ পাহাড় অবস্থিত। এ পাহাড়ের পাদদেশে মক্কার কুরাইশ ও মদিনার মুসলিমদের মধ্যে দ্বিতীয় যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মক্কার বাহিনীর আক্রমণের বিশ্বনবী আহত হন এবং তাঁর একটি দাঁত মোবারক শহীদ হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি নিহত হয়েছেন। হৃদয়বিদারক এ যুদ্ধে প্রথম দিকে মুসলিমরা বিজয় লাভ করলেও পাল্টা আক্রমণে কুরাইশদের তুলনায় মুসলিমদের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়। হযরত হামজা (রা)সহ ৭০ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। ওহুদ পাহাড়েরর পাদদেশে ৭০ জন সাহাবী কে দাফন করা হয়। ওহুদ যুদ্ধে শহীদদের কবরস্থানে হুজুর (সা.) প্রায় সময়ই এখানে আসতেন এবং তাদের কবর জিয়ারত করতেন। এছাড়াও মদিনার বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি কবরস্থান রয়েছে। সারাবিশ্ব থেকে আগত মুসলিম উম্মাহ সাহাবাদের কবর জিয়ারত ও ওহুদ প্রান্তর দেখতে এখনও ওহুদ প্রান্তর সবচেয়ে বেশি পরিদর্শন করেন।
ঐতিহাসিক খন্দকের যুদ্ধঃ- ইসলামের ইতিহাসে যতগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে তার মধ্যে খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ ছিল অন্যতম। যা আহজাব নামেও পরিচিত। আহজাব অর্থ সম্মিলিত বাহিনী। ঐতিহাসিক খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৫ হিজরির শাওয়াল মাসে। মূলত, ওহুদের যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই এই যুদ্ধটি সংঘটিত হয় মক্কার কুরাইশ, মদিনার ইহুদি, বেদুইন, পৌত্তলিকেরা সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করেছিল এ যুদ্ধে। এই যুদ্ধে জয়ের ফলে ইসলাম পূর্বের চেয়ে আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠে।

 

মদিনায় ৭ টি বিশেষ মসজিদ প্রায় একই এলাকায় অবস্থিত, যেখানে মুহাম্মদ (সা.) নিজে বা সাহাবীগন খন্দকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। মসজিদগুলি যথাক্রমে আল ফাত মসজিদ, সালমান আল ফারসি মসজিদ, আবুবকর আস সিদ্দিক মসজিদ, ওমর বিন খাত্তাব মসজিদ, সা’দ বিন মা’জ মসজিদ , আলী বিন আবি তালিব মসজিদ , ফাতেমা আজ জাহারা মসজিদ।
১। মদিনায় মুসলমানদের ক্রম উত্থান দেখে মক্কার কুরাইশসহ বিভিন্ন গোত্র মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার চক্রান্ত করে। মদিনার ইহুদিরাও এই কূটজালে অংশ নেয়।
২। মদিনার তিনদিক প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত থাকলে উন্মুক্ত দিক থেকে মুশরিকরা আক্রমন করবার পরিকল্পনা করে।
৩। মুশরিকদের ছিল প্রায় ১০,০০০ সেনা, ৬০০ উট ৩০০ ঘোড়া এবং বিপুল অস্ত্র সরঞ্জাম। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের ছিল ৩০০০ এর মত সেনা আর হাতে গোনা অস্ত্রাদি। তাই মুশরিকরা জয়ের ব্যপারে সুনিশ্চিত ছিল।
৪। সাহাবী সালমান আল ফারসি (রা.) ছিলেন পারস্যবাসী। তিনি পরিখা বা খন্দকের যুদ্ধের ধারণা দেন। এটি আরববাসীর কাছে অপরিচিত ছিল। প্রতি দশজন করে আনসার ৪০ হাত করে খন্দক তৈরী করেন। মুহাম্মদ( সা.) স্বয়ং মাটি কাটতে হাত লাগান।
৫। মুশরিকরা মদিনার কাছে এসে অপ্রত্যাশিতভাবে খন্দক দেখে বিস্মিত ও হতাশ হয়। এই খন্দক অতিক্রম করে ঘোড়াদেরকে কোনক্রমেই মদিনায় নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিল না। কেউ কেউ সেটা চেষ্টা করলে তখনই তীরের আঘাতে প্রাণ হারাতে হত। ফলে মুশরিক এবং ইহুদিরা মুসলমানদের ঘিরে রাখলেও তারা সন্মুখ সমরের কোন সুযোগই পায় নি। বরং ৪০ দিন নিস্ক্রিয় থেকে নিজেরায় আত্মকলহ – দল – উপদলে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রবল ঝড় বৈরী আবহাওয়া তাদের ব্যপক রশদই শুধু নষ্ট করে নি বরং মনোবল পুরোপুরি ভেঙ্গে দেয়। ফলে মদিনা বিজয়ের স্বপ্নভংগের সবাদ নিয়ে তারা মক্কায় ফিরে যায়।
৬। বর্নিত আছে,এই দীর্ঘ সময়ও মুসলমানদের খাদ্যের ঘাটতি পড়ে । ক্ষুধায় এক সাহাবা মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে গেলে তিনি রাসুলকে পেটে পাথর বেঁধে ক্ষুধা চেপে রাখতে দেখেন। এই সময় ছোট একটি বকরী এবং সামাণ্য গম দিয়ে খাবার রান্না হলে দৈবক্রমে সেটি হাজারজন মুসলমান ভরপেট খেয়ে ক্ষুধা নিবৃতি করেন।

 

মসজিদে কুবাঃ- ইসলামের ইতিহাসে নির্মিত প্রথম মসজিদ এটি। মসজিদে নববী থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় আগমন করে প্রথম শহরের প্রবেশদ্বারে কুবা নামক স্থানে নামাজ পড়েন। পরে এখানে মসজিদ গড়ে ওঠে। মসজিদটি রাসুল (সা.)-এর হিজরতের সময় কুবায় অবস্থানের সময় নির্মাণ করা হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন,‌‌‌‌‌‌ হাদিস শরিফে বর্ণিত ‘যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধের সহিত ঘর থেকে অজু করে কুবার মসজিদে নামাজ আদায় করবে, সে ওমরার সওয়াব পাবে।’ (ইবনে মাযাহ)
মসজিদ কিবলাতাঈনঃ- এ মসজিদে একই নামাজ দুই কিবলামুখী হয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে ওহি পাওয়ার পর নবী (সা.) ‘মসজিদ আল-আকসা’ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নামাজের মাঝখানে মক্কামুখী হয়ে পরবর্তী অংশ সম্পন্ন করেছিলেন। এ জন্য এ মসজিদের নামকরণ করা হয় কিবলাতাঈন (দুই কিবলা মসজিদ)। মসজিদের ভেতরে মূল পুরোনো মসজিদের অংশ অক্ষত রেখে চারদিকে দালান করে মসজিদ বর্ধিত করা হয়েছে।
জান্নাতুল বাকি (আরবি: مقبرة البقيع The Baqi Cemetery)ঃ- আরবীতে বলা হয়- বাকিউল গারকাদ, মাকবারাতুল বাকি। সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত একটি কবরস্থান। এটি মসজিদে নববীর দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত। পূর্বে এখানে কবরের উপর স্থাপনা ছিল। সৌদ বংশ ক্ষমতাতে আসার কবরগুলোতে ছোট চিহ্ন রেখে স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেয়। ইমাম মালিক (রহ.)-এর কথামতে জান্নাতুল বাকিতে অন্তত দশ হাজার সাহাবার কবর রয়েছে ইতিহাস থেকে জানা যায়।
প্রতিবছর হজ্জের সময় মদিনায় অবস্থানরত কোনো হজ্জ পালনকারীর মৃত্যু হলে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। এছাড়াও মদীনার বাসিন্দারাও মারা গেলে এখানে দাফনের সুযোগ পায়। তবে মুহাম্মাদ (সা:)-এর সাহাবাদের ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ হিসেবে এ কবরস্থানের শুরুর অংশে যাদের সমাহিত করা হয়েছে তাদের স্থানে এখন আর নতুন করে কাউকে কবরস্থ করা হয় না। সৌদি সরকারের তত্ত্ববধানে জান্নাতুল বাকি জিয়ারতের জন্য ফজর ও আসরের নামাজের পর খুলে দেয়া হয়। এসময় মুসলিম পুরুষরা জিয়ারতের জন্য ভেতরে যেতে পারে। ইসলামি শরিয়তে নারীদের কবর জিয়ারত করা বৈধ নয় মর্মে তাদের যেতে দেয়া হয় না। হাদীস বিশারদগণ জিয়ারতের সময় জান্নাতুল বাকিতে সমাহিতদের প্রতি অনির্দিষ্টভাবে সবাইকে একসঙ্গে সালাম দেওয়া ও তাদের জন্য দোয়া করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
ইসলামের নিদর্শন গুলোর দর্শনে অনন্য দৃষ্টি নন্দন স্পট মদিনাতুল মুনাওয়ারা। যেখানে হৃদয়বিদারক ঘটনা আর বিজয়ের শিক্ষা নেওয়ার অনেক বৈশিষ্ট্য দৃষ্টান্ত স্থাপন।

লেখক পরিচিতি

কলামিস্ট ও সাহিত্যিক , মদিনা, সৌদি আরব
[email protected]

 
  
%d bloggers like this: