• আবদুল্লাহ আল মেহেদী

মুহাম্মদ বুআজিজি। পরাজিত এক সৈনিকের নাম। পারিবারিক জীবনে ক্লান্ত ন্যুজ এক সদস্য। পরিবারে সংসার নামক রশি টানতে টানতে ক্লিষ্ট শরীর। একক উপার্জন দিয়ে চলে সাত সদস্যের মুখ ও পেটের চাহিদা। কর্ম জীবনে সামান্য ফেরিওয়ালা। বাল্যকালেই পিতাহারা হন বুআজিজি। ছোট একটি কক্ষে ছয় ভাইবোনের বেঁচে থাকার যুদ্ধ। বয়স ১০ বছর তখন সংসার নামক সংগ্রামের যোদ্ধা বালক বুআজিজি। সেনাবাহিনীতে আবেদন করেও ব্যর্থ, চাকুরি জুটেনি কপালে। উদার হৃদয় ছিল তার। সামান্য আয় থেকেই এগিয়ে যেতেন অন্যের জন্য। সাহায্য করতে চাইতেন, সামান্য ফল বিক্রেতা হলেও অসহায় মানুষ দেখলে ফল বিলিয়ে দিতেন। নতুবা আয়ের একটা অংশ দিয়ে দিতেন। বুআজিজি তিউনিসিয়ার এক যুবকের নাম।

২৬ বছর বয়স বুআজিজি’র। পুরো ভরা যৌবন। প্রচণ্ড সংগ্রাম সংসার নিয়ে। দিনরাত পরিশ্রম। তবুও সংসার নামক যুদ্ধের ময়দানে এগোতে পারে না এই তরুণ। সব মিলিয়ে বুআজিজি প্রতি মাসে সব মিলিয়ে ১৪০ ডলার আয় করতেন। রাস্তায় ফল বিক্রির কারণে তিনি তিউনিসিয়ার পুলিশের মার খেয়েছেন অনেকবার। অবস্থা অনেকটা আমাদের বাংলাদেশের মতো। বাংলাদেশের মতো বললাম এই কারণে-যারা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী তারা পুলিশের কাছে কেমন হয়রানি হয় যারা প্রত্যক্ষদর্শী তারা জানেন। নানা অপমানও সয়েছেন পুলিশের হাতে বুআজিজি। তবুও সহ্য করেছেন এত অপমান আর যন্ত্রণা। লাইসেন্স নাই তাই পুলিশ বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিত। প্রতিবাদী আর সৎ সাহস দেখাতে গিয়ে মালামালসহ বেশ কয়েকবার পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে দেনার পরিমাণ বাড়তে থাকে। দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় ২০০ ডলারের মতো। পুলিশ আবার জানায় লাইসেন্স না হলে ফেরি করা যাবে না। তরুণ উপায় না পেয়ে স্টেট অফিসে যোগাযোগ করেন, দেখেন পারমিট লাগে না। পারমিটের জন্য ফায়জা হামদি নামে এক মহিলা পুলিশ তাকে হেনস্তা করেছেন। তার গালে চড় মারেন, মুখে থু থু দেন। পুলিশ তার মাপযন্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গাড়িটি নর্দমায় ফেলে দেন। তরুণ বুআজিজি বিচারের দাবিতে গভর্নর অফিসে গেলেন। প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে আসতে হয় তাকে। বুআজিজি তখন বলেন, ‘যদি সাক্ষাতের অনুমতি না দেন গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করব। কে শোনে কার কথা! তার কথা কেউ শোনেনি। গভর্নর অফিসের সামনের ব্যস্ত রাস্তায় লোকজনের সম্মুখে নিজের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বাঁচার কোনো পথ খোলা ছিল না।’ এই গেল তিউনিসিয়ার বুআজিজি’র জীবন যুদ্ধের কথা। ঘটনার সময়কাল ২০১০ সালে। আত্মহত্যা ইসলামে কবিরাহ গুনাহ, আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি মহান রব বুআজিজি’র এই অপরাধ যেন ক্ষমা করে দেন।

তিউনিসিয়ার মন্দ অর্থনীতি,বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে অতিষ্ঠ মানুষের কাছে বুআজিজি নতুন বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তা ছিল সংগ্রাম ও বিদ্রোহের বার্তা। আমাদের দেশের চলমান অবস্থা সেরকম। টিসিবির ট্রাকের সামনে মানুষের লাইন দেখে পরিস্থিতি অনুমেয়। চলতি বাজার মূল্যের করুণ পরিস্থিতি মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের আহাজারি প্রমাণ করে। লিটার প্রতি সয়াবিনের দাম আর কাঁচা বাজারের ঊর্ধ্বগতি জানান দেয় দেশের প্রকৃত অবস্থার চিত্র। বুআজিজি সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হন। সে বার্তা ছড়িয়ে যায় পুরো আরব বিশ্বে। তার আত্মহননের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবেদিন বেন আলীর ২৩ বছরের শাসন শেষ হয় গণবিক্ষোভের কারণে।

রাগে বুআজিজি আত্মহননের পথ বেছে নিলেও বাজারে প্রত্যক্ষদর্শীরা আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। ৯০ ভাগ পুড়ে যায়। চিকিৎসাসেবার হাল আমাদের দেশের মতোই! হাসপাতাল ১১০ কিলোমিটার দূরে। সংবাদ পুরো বিশ্ব জেনে যায়। প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবেদিন বেন আলী তাকে দেখতে হাসপাতালে আসেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ফ্রান্সে পাঠাবার ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট। পরে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৮ দিন জীবন যুদ্ধে বেঁচে থাকার পর পরের বছর ৪ জানুয়ারি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন যুবক বুআজিজি। আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করুক আমিন।

জানাজায় পাঁচ হাজার অধিক মানুষের সমাগম হয় বুআজিজির। বুআজিজির জানাজা থেকে শপথ ও ‘আরব বসন্তের’ বীজ বপন করেছিল সে দেশের নাগরিকরা। সারা তিউনিসিয়াতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে যায়, দুঃশাসন আর কুশাসন বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান তারা সঙ্ঘবদ্ধ হতে থাকেন। বাক স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের সূচনা, সেবা খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমাধান, লাগামহীন ঘোড়ার মতো নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, সরকার পরিবর্তন ইস্যু নিয়ে যেন পেট্রল ঢালা হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবেদিন বেন আলীর পতন হয়।

আন্দোলন ছড়িয়ে যায় দেশের বাইরে। নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয় মিসরে। ইসলামী আন্দোলনের প্রতীক মুসলিম ব্রাদার হুড আন্দোলন শুরু করে। টানা বিক্ষোভ আর প্রতিবাদে মাত্র ১৮ দিনের মাথায় স্বৈরশাসক হোসনি মুবারক পদত্যাগ করেন। সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করে নির্বাচন দেয়। ড. মোহাম্মদ মুরসি প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৩ সালে বৈধ সরকারকে উৎখাত করে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আলসিসি ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে মুরসিকে জেলে আবদ্ধ করেন। ১৭ জুন ২০১৯ সালে কারাগারে মারা যান মুরসি। সিসির ক্ষমতায় আরোহণকে কেন্দ্র করে আবার উত্তাল হয়ে ওঠে মিসর। তবে বেশ শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামাল দেন সিসি, হয়ে ওঠেন খানিকটা প্রতিশোধপরায়ণ। মুসলিম ব্রাদারহুডের অনেক নেতাকে বন্দি করা হয়। এসব বন্দির মধ্যে শত শত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বাহরাইনে আরব বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সরকার তখন কিছু সংস্কারের কথা জানায়। এতে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের গদিচ্যুত হতে হয়নি। আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চলছেই। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। দমন-পীড়নের নানা অভিযোগ তুলে তা তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। এমন দাবির মুখে দেশটির বাদশাহ স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা জানানো হলেও দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

২০১১ সালে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ওই বছরের অক্টোবরে তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর দেশটিতে অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এখন এখানে চলে–জোর যার মুল্লুক তার নীতি। দেশটিতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থাসহ সবকিছু ভেঙে পড়েছে। সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থী জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। যেসব দেশে আরব বসন্ত এসেছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে,কার্যত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। বিভেদ-সংঘাত বেড়েছে, বেড়েছে হতাশা ও রক্তপাত।

বাংলাদেশের চলমান অবস্থান নিয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে চাল, ডাল, তেল, আটা, ময়দার দাম। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় টিসিবির ট্রাকের সামনে লম্বা হচ্ছে নিম্নবিত্তের লাইন। চাল-ডালসহ নিত্যপণ্য কিনতে টিসিবির লাইনে ঝুঁকছেন মধ্যবিত্তরাও। বাজারে গেলে মিলবে না সংসার খরচের হিসাব, তাই টিসিবির ট্রাকের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘলাইন রাজধানী বাসিন্দাদের। নিত্যপণ্যের দামের এ ঊর্ধ্বগতির কারণে সকাল থেকেই রাজধানীতে বিভিন্ন পয়েন্টে টিসিবির গাড়ির কাছে দেখা যায় ক্রেতাদের গাদাগাদি ভিড়। পত্রিকাগুলোতে বিশাল হেডিংসহ খবর হচ্ছে-খোলাবাজার কর্মসূচির আওতায় টিসিবির ট্রাকগুলোর সামনে ভিড় করছে মধ্যবিত্তরাও। মধ্যবিত্তদের আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দর। খাবি খাচ্ছে মানুষ জীবনযাপনে। রোজা সামনে রেখে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা কোমড়বেঁধে লেগেছে মজুদ বাড়াতে। প্রভাব পড়ছে বাজারে। পরিত্রাণের উপায় কী? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন সাধারণ মানুষের জানা নেই। তারা চোখে শর্ষে ফুল দেখছে শুধু এটাই সত্য।

আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা বলা হয়। বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা এই দেশের কারো নেই। কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু আমদানিকৃত পণ্যটি দেশে প্রবেশকালে করছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়েও যখন ক্রেতার ঘাম ঝরিয়ে দিচ্ছে তখন কি আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে পারা যায়। এখানেও স্পষ্টত বোঝা যায়, আসলে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অকালে বৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে, যখন রোজার বাজার শুরু হবে তখন এই ধাপকেই আরও বাড়িয়ে দেওয়া হবে। যদি লাগাম টেনে ধরা না হয় তাহলে আসন্ন রোজায় যে সাধারণ মানুষের অবস্থা কোরবানির গরুর মতো হবে না, তা বলা যাচ্ছে না। অতি দ্রুত বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হোক। অন্তত মজুদদার এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের লাগাম টেনে ধরতে হবে না হলে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ক্ষোভকেও অনিয়ন্ত্রিত করে দিতে পারে।

দুঃখগাথার মাঝে বুআজিজিকে এখনো অনুসরণীয় মনে করা হচ্ছে। আবদুর রাজ্জাক জরগি নামে ৩২ বছরের এক সাংবাদিক জীবিকার অভাবে যারা কষ্ট পাচ্ছে তাদের জন্য বিপ্লব শুরু করার আহ্বান জানিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহনন ইসলামে অনুমোদিত নয়। বুআজিজির আত্মহনন মানুষকে কতটুকু নাড়া দিয়েছে জরগির মৃত্যু তার প্রমাণ।